
X
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আর জলদস্যুতা যেন দুশ্চিন্তা ভর করছে ট্রলার মালিক-জেলেদের। টানা ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা জুলাই মাসের ২৩ তারিখ শেষ হলেও সাগর উত্তাল থাকায় ওই মাসে সাগরে মাছ ধরতে পারেনি জেলেরা। এরপর আগস্ট মাসজুড়ে মোটামুটি নিয়মিত সাগরে আসা-যাওয়া সম্ভব হলেও ওই মাসের শেষদিকে আবারও সাগর উত্তাল হয়ে ওঠে। ফলে মাছ না ধরেই ফিরে আসতে হয় জেলেদের। কিন্তু পক্ষকালের বেশি সময় পর গত শনিবার থেকে সাগরের আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে এলে জেলেরা মাছ ধরা জন্য আবারও সাগরে যেতে শুরু করেছে।
অনেকেই লোকসান আর সইতে না পেরে বিক্রি করে দিচ্ছে ট্রলার। তবে জ্বালানি তেলের মূল্য কমানোর দাবি জানিয়েছে ট্রলার ও মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতি নেতৃবৃন্দ।
৬ নম্বর ঘাটে অবস্থান করা জেলে মো. রশিদ বলেন, ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সপ্তাহখানেক মাছের দেখা পেয়েছিলাম। কিন্তু এরপর তীব্র গরমে আর মাছের দেখা পায়নি। এখন আবার গেল কয়েকদিন ধরে বৈরী আবহাওয়া। এখন কোথায় যাবে, একদিকে বৈরী আবহাওয়া আর অন্যদিকে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি। খুবই সমস্যার মধ্যে রয়েছি।
অন্য এক জেলে নুরুল আলম বলেন, ৩ নম্বর সতর্ক সংকেতের কারণে এক সপ্তাহ ধরে ঘাটে বসে আছি। এখন হাতে টাকাও নেই। ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। সাগরে মাছ শিকারে যেতে না পারলে তো ট্রলার মালিক টাকা দেয় না।
ফরিদ উদ্দিন নামের আরেক জেলে বলেন, মুখে কীভাবে হাসি থাকবে বলেন; গত ৮ দিন ধরে ১৫ মাঝিমাল্লা নিয়ে ঘাটে বসে আছি। এখন সংসার চলছে না। ট্রলার মালিকও টাকা দিচ্ছে না। তাই আমাদের দুশ্চিন্তা যেন পিছুই ছাড়ছে না। তেলের দামও অতিরিক্ত। ১০ থেকে ১২ দিনের প্রতি ট্রিপে একটি ট্রলারের লাগে দুই থেকে আড়াই হাজার লিটার ডিজেল। তেলের দাম বাড়ায় খরচ বেড়েছে অনেক। এত দাম দিয়ে তেল কিনে সাগরে ট্রলার নামাতে ভয় পাচ্ছেন ট্রলার মালিকরা।
কক্সবাজার মৎস্য ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদ সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি ও জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সদস্য মো. ওসমান গণি টুলু বলেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে বাঁকখালী নদীর উপকূলে এরই মধ্যে ট্রলার নোঙর করা রয়েছে। অনেক ট্রলার মালিক এখন চিন্তা সাগরে ট্রলার না পাঠানোর।
জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমদ জানান, কক্সবাজারে ছোট-বড় প্রায় সাত হাজার যান্ত্রিক নৌযান সাগরে মাছ ধরে। এর মধ্যে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় এক তৃতীয়াংশ ট্রলারই সাগরে মাছ ধরতে গেছে। বাকি ট্রলারগুলোও রবি-সোমবারের মধ্যে সাগরে মাছ ধরতে যাবে।
তিনি জানান, ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা জুলাই মাসের ২৩ তারিখ শেষ হলেও সাগর উত্তাল থাকায় ওই মাসে সাগরে মাছ ধরতে পারেনি জেলেরা। এরপর আগস্ট মাসজুড়ে মোটামুটি নিয়মিত সাগরে আসা-যাওয়া সম্ভব হলেও ওই মাসের শেষদিকে আবারও সাগর উত্তাল হয়ে ওঠে। ফলে মাছ না ধরেই ফিরে আসতে হয় জেলেদের।
জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির মতে, সাগরে মাছ ধরার জন্য বিভিন্ন আকারের বোট রয়েছে। এর মধ্যে বড় বোটে ৩০-৪০ জন এবং ছোট বোটে ৫-১৭ জন জেলে থাকে।
এদিকে সাগরে মাছ ধরা শুরু হওয়ায় শনিবার থেকে শহরের প্রধান মৎস্য অবতরণকেন্দ্র ফিশারি ঘাটসহ শহর ও শহরের বাইরের জেলেপল্লিগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে বলে জানান ফিশারিঘাটের মৎস্য ব্যবসায়ী ঐক্য সমবায় সমিতির সভাপতি জয়বাল আবেদীন হাজারি।
তিনি জানান, মাছ ধরার ওপর ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র প্রতিবছর আড়াই মাসের কাছাকাছি বন্ধ থাকে। সাগরে মাছ ধরা শুরু হলে এক সপ্তাহ থেকে পক্ষকাল পরই ট্রলারগুলো মাছ ধরে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে পৌঁছে। আর এবার মাছ ধরা শুরু হয়েছে নিষেধাজ্ঞা অতিবাহিত হওয়ারও ৮-১০ দিন পর। তার মানে এবার প্রায় তিন মাসের কাছাকাছি মাছের বিকিকিনি বন্ধ। আবার অক্টোবরের বন্ধে আরও এক মাস মিলে প্রতি বছর চার মাস সময় বন্ধ থাকছে মৎস্য ব্যবসা।
কক্সবাজারে নিবন্ধিত নৌযান রয়েছে সাড়ে ৫ হাজারের বেশি। আর লক্ষাধিক জেলে থাকলেও নিবন্ধনের আওতায় এসেছে প্রায় ৬৩ হাজার জেলে।