সরকারের উন্নয়নের সুফল ভূলুণ্ঠিত
"সন্দ্বীপ নৌ রুটে চলছে আনোয়ার রাজত্ব"
কামরুজ্জামান রনি, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, ১২:৪১ এএম আপডেট: ২৮.০৯.২০২৩ ১২:৫৫ এএম (ভিজিট : ২৪৮৩)

X
বঙ্গোপসাগরের বুকের সন্দ্বীপ উপজেলা থেকে মূল জেলা চট্টগ্রামে যাতায়াতের একমাত্র উপায় নৌ-রুট৷ আর এই নৌ-রুটটির ঘাট থেকে শুরু করে নৌ-রুটে চলাচলকারী লাল বোট, কাঠের বোট, স্পিডবোট সবই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ার হোসেনের একক নিয়ন্ত্রণে। আজ অবধি ২য় কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নতুন সার্ভিস নামানোর সুযোগ না দিতে হেন কোন কূটকর্ম নেই যা এই আনোয়ার করেননি৷ ফলে সন্দ্বীপের চার লক্ষাধিক জনগোষ্ঠীকে জিম্মি করে যেমন খুশি তেমন শোষণ করছে তিনি৷ একই সাথে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদকে ন্যায্য ইজারা পরিশোধ না করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে৷
বর্তমান সরকারের তিন মেয়াদে একাধারে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, উপজেলার মগধরা ইউপি চেয়ারম্যান পদে বসে শুধু সন্দ্বীপবাসীকে পারাপারের অর্থে গড়ে তুলেছেন টাকার পাহাড়৷ এই টাকার জোরে তিনি কাউকে পরোয়া না করে যাত্রীদের এমনভাবে বিষিয়ে তুলেছেন যে এর প্রভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সন্দ্বীপের যুগান্তকারী সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে৷
এক যুগেরো বেশী সময় ধরে আনোয়ার হোসেনের এককভাবে সন্দ্বীপ নৌ-রুটের কুমিরা ও গুপ্তছরা ঘাট ইজারা নিয়ে রেখেছে। সন্দ্বীপে পারাপার করতে গেলে আনোয়ার হোসেন ছাড়া উপায় নাই। সরকারে যে একটি মাত্র জাহাজ সার্ভিসটি আছে সেটিতে উঠতে-নামতেও আনোয়ার হোসেনের লাল বোট লাগবেই৷ এসব লাল বোটগুলো যাত্রীদের জাহাজে উঠানামা বাবদ নিচ্ছে ৪০ টাকা করে৷ যেমন খুশি তেমন চালানো এই লাল বোট ২০১৭ সালে যাত্রীদের কাছ থেকে বকশিশ আদায় করতে গিয়ে ১৮ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটলেও আজ অবধি নিহতের পরিবারকে কোন ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি। সন্দ্বীপে কাঠের তৈরি ট্রলারে যাতায়াত করতে গুনতে হয় ২০০ টাকা। এসব ট্রলারের প্রায় সবগুলির কোনো ফিটনেস নেই। ট্রলারে রাখা হয় না পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট কিংবা বয়া। আনোয়ারের একক নিয়ন্ত্রণে ১৫টি স্পিডবোট চলাচল করে যেগুলোতে জনপ্রতি ভাড়া আদায় হচ্ছে ৩৮০ টাকা৷ এসব ভাড়া কে নির্ধারণ করে দেয় জানেনা যাত্রীরা।
আবহাওয়া বৈরী হলে তো বটেই সূর্য ডুবলেই জনগণ কার্যত দ্বীপেই বন্দি হয়ে থাকে৷ কারণ সূর্য ডুবলে সন্দ্বীপ থেকে কিংবা সন্দ্বীপের উদ্দেশ্য কোনো নৌযান চলাচল করে না৷ ফলে সূর্য ডোবার পর জরুরি চিকিৎসার জন্য সন্দ্বীপ থেকে রোগীকে পার করা সম্ভব হয় না৷ তবে স্থানীয় বাসিন্দা আজিম উদ্দিন বলেন, বিকেলে নির্দিষ্ট টাইমের পর কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে দিনের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয়৷ রাত কম হলে লাল বোট ভাড়া করতে গুনতে হয় ৭ হাজার টাকা। এই লাল বোট মালিক একজন জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগ নেতার (আনোয়ার হোসেন) কাজই হলো যাত্রীদের রক্তচোষা। কোনো বিষয়ে জনগণ প্রতিবাদ করলেই আনোয়ার বাহিনী জনগণকে পেটাতে সর্বদা প্রস্তুত থাকে৷ প্রায় প্রতিমাসেই এক বা একাধিক মারধরের শিকার হয় সন্দ্বীপবাসিরা।
এতো বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায়ের পরও এসব নৌযানগুলো থেকে সরকারকে তেমন কোন রাজস্বই দেয়া হয় না বলে জানালেন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এটিএম পেয়ারুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, "সন্দ্বীপে যে পরিমাণ অর্থ আদায় হয় সে অনুপাতে তেমন কোন রাজস্ব পাওয়া যায় না৷ আমি দ্বায়িত্ব নেয়ার পর সেখানে একক রাজত্ব ভেঙ্গে দিতে উন্মুক্ত টেন্ডার আহ্বান করি৷ দুঃখের বিষয় এই টেন্ডার কার্যক্রমকে নানান মামলা দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে৷ তবে আমি এসব আইনি জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত টেন্ডার বাস্তবায়ন করাতে বদ্ধ পরিকর৷"
সরকারের উন্নয়নের সুনাম গিলে খাচ্ছে আনোয়ার : আওয়ামী লীগ সরকারের এ আমলে সন্দ্বীপে উন্নয়নের জোয়ার উঠেছে৷ সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে সাগদের তলদেশ দিয়ে বিদ্যুৎ গেছে সন্দ্বীপে। যা একটি যুগান্তকারী উন্নয়ন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। আগে ডিজেল চালিত জেনারেটর দিয়ে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতো পিডিবি। আজ সেই অন্ধকার দ্বীপের সর্বত্র ছড়াচ্ছে বিদ্যুতের আলো। এছাড়া প্রায় প্রতিবছর নতুন নতুন সড়ক, দ্বীপ রক্ষা বাঁধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার থেকে সরকারি কার্যালয়ে উঠছে নতুন নতুন ভবন। উপজেলা এলজিআরডি অফিস বলছে, গত তিন বছর শুধু এলজিআরডি বিভাগের ৩০০ কোটি টাকার কাজ হয়েছে সন্দ্বীপে। সন্দ্বীপ উপজেলায় বর্তমান সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। অবিশ্বাস্য উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে ৯০ বর্গমাইলের এ উপজেলা।
এসব উন্নয়নের ফলে সরকারের যে ভালো ইমেজ সৃষ্টি হয়েছে এর সবই একাই গিলে খাচ্ছে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলার মগধরা ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন৷ যারাই এই নৌরুটে পারাপার হয় তারাই নানা ভোগান্তি ও বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে৷ বছরের পর বছর একচেটিয়া সন্দ্বীপের সকল একক নৌ-রুট দখলে রেখে ইচ্ছে মত ভাড়া আদায়কে স্থানীয়রা বলছে রক্তচোষা৷ ফলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, এমন কোন পরিবার সন্দ্বীপে নেই যারা এই সন্দ্বীপ থেকে কুমিরা পারাপার হয় তারাই সরকারের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে৷ সন্দ্বীপকে প্রধানমন্ত্রী অনেক কিছুই দিয়েছেন তবে এই নৌ-পথের জুলুমবাজির কারণে সন্দ্বীপের বাসিন্দারা বেশ ক্ষুব্ধ। আমরা অনেক সময় বিষয়টি দলীয়ভাবে আলোচনার করেছি৷ কারণ এর কারণে সরকারের ইমেজ ক্ষুণ্ন হচ্ছে ফলে সরকার বিরোধীরা আসন্ন নির্বাচনে এই ইস্যুটিকে তুলে ভোট কাটবে৷ নির্বাচনের আগে এই আনোয়ার সিন্ডিকেট ভেঙ্গে না দিলে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছে স্থানীয় আওয়ামী লী।
জেলা পরিষদ সূত্র বলছে প্রতিদিন আনোয়ার হোসেন ন্যূনতম লাভ করে তিন লক্ষাধিক টাকা৷ সেই হিসেবে প্রতিমাসে প্রায় কোটি টাকা আয় করা আনোয়ার হোসেন জেলা পরিষদকে তেমন একটা রাজস্ব না দিলেও স্থানীয় এমপির অনুষ্ঠান সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের যাবতীয় খরচ বহন করে থাকেন৷ এছাড়া বিভিন্ন সংস্থা, উপজেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে স্থানীয় কিছু গণমাধ্যম কর্মীদেরও বিনামূল্যে পারাপারের সুযোগের পাশাপাশি নানান ভাবে ম্যানেজ করে থাকেন৷ এই বিষয় গুলি ইতিমধ্যে দুদককে জানানো হয়েছে।