
X
ঢাকার ধামরাই উপজেলার সূয়াপুর ইউনিয়নের বিশ্বনাথ চন্দ্র মনিদাস পৃথিবীর কোন জিনিসই ফেলনা নয়। তিনি ফেলনা প্লাস্টিক থেকে তৈরি করছেন গৃহকার্যে ব্যবহৃত রকমের হস্তশিল্প।
মনিদাস তৈরি করছেন ধান সংরক্ষনের গোলা, ঘরের চাল, বেড়া এবং কবুতরের খোঁপসহ দৈনন্দিন ব্যবহার্য নানান হস্তশিল্প। আর এসব তৈরিতে কাচাঁমাল হিসেবে ব্যবহার করছেন স্থানীয় বিভিন্ন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের ওয়ান টাইম বেল্ট।
দেখলে মনে হবে বাঁশ অথবা বেতের তৈরি, আর প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হলেও এগুলো বুনা হচ্ছে বাঁশ ও বেতের মতো করেই। তাই গ্রামীণ জনপদের নারী-পুরুষ সামান্য প্রশিক্ষনের মাধম্যেই তৈরী করতে পারছেন এসব পণ্য।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সূয়াপুর বাজারে বিশ্বনাথ চন্দ্রের 'লোকনাথ সৌরভ স্টোরের' দেখাদেখি এমন আরো ৩/৪টি প্লাস্টিকের বেল্ট থেকে বিভিন্ন পন্য তৈরির প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তারা উপজেলার বিভিন্ন গার্মেন্টসের পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের এসব বেল্ট কেজি দরে কিনে আনেন। পরে স্থানীয় কারিগররা তাদের নিপুন হাতে তা থেকে তৈরি করেন একের পর এক গৃহস্থালির নানান ব্যবহার্য সামগ্রী।
এলাকার এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিটিতে কাজ করছেন গড়ে ৮ থেকে ১০ জন করে শ্রমিক। এসব পণ্য স্থানীয় বাজারে ও যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী মানিকগঞ্জ, গাজিপুর ও টাঙ্গাইলে।
এসব পন্য তৈরির বিষয়ে মনি দাস দৈনিক বাংলাদেশ বুলেটিনকে জানান, প্রতিটা কারিগরকে মজুরী দেয়া হয় কেজি হিসেবে। প্রতি কেজি পন্য তৈরির জন্য তাদের মজুরি হিসেবে ২৫ টাকা করে দেয়া হয়। দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১২ কেজি পন্য বুনতে পারেন একজন কারিগর।
এ বিষয়ে কথা হয় শিল্পি রানী নামে নারী কারিগরের সাথে তিনি বলেন, প্রতি মাসে প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা আয় হয়। স্বামীর ইনকামের পাশাপাশি তার এই বাড়তি আয় দিয়েই চলছে তাদের তিন সন্তানের লেখাপড়ার খরচ।ছিলোনা বাড়তি কোন আয়ের মাধ্যম। এর ফলে সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকতো। তবে এখানে কাজ করে তিনি নিজেই এখন স্বাবলম্বী।
ষাটোর্ধ্ব নির্মল সরকার তিনিও আপন মনে বুনে চলেছেন প্লাস্টিকের বেড়া, তাকে জিজ্ঞেস করতেই জানালো, একসময় ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। এখন বয়সের কারনে ভ্যান টানার শক্তি নেই। ছেলেরাও বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছে। তাই এই কাজ করেই স্ত্রীসহ দুজনের আহার যোগার করেন তিনি।
পার্শ্ববর্তী মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলা থেকে ধানের গোলা কিনতে আসা আসাদুজ্জামান নামের এক কৃষকের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমি মাঝারি সাইজের ধান সংরক্ষণের গোলা কিনেছি। যার ওজন হয়েছে ৩০ কেজি। ১২০ টাকা দরে দাম হয়েছে তিন হাজার ছয়শো টাকা। এই গোলাটি অনেক টেকশই সহজে নষ্ট হবেনা। আমরা আগে বাঁশের তৈরী গোলায় ধান রাখতাম তবে সেগুলো বেশীদিন ব্যবহার করা যায়না ইঁদুর কেটে ফেলে। ফলে অনেক ধান নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এখানকার প্লাস্টিকের তৈরী গোলায় ধান রাখলে তা সহজে নষ্ট হয়না এবং ইঁদুরেও কাটতে পারবেনা ফলে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়।
বিশ্বনাথের এই কারখানার পাশেই এই প্লাস্টিকের বেড়া দিয়ে তৈরি ঘরে বসবাস মাধবী দাসের। তার সাথে কথা হলে তিনি জানান, টিন কিংবা ইটের ঘর তৈরিতে অনেক খরচ। আমাদের সেই সামর্থ্য নেই তাই প্লাস্টিকের বেড়া দিয়ে ঘর বানিয়েছি। এতে খরচ তুলনামূলক অনেক কম এবং রোদ বৃষ্টিতে নষ্ট হবারও কোন আশংকা নেই।
এ বিষয়ে শিল্পটির উদ্যোক্তা বিশ্বনাথ চন্দ্র মনিদাস, প্রায় ৪ বছর আগে এই ব্যবসাটা শুরু করেছি। আগে আমি গরু লালন-পালন করতাম কিন্তু গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় সেই ব্যাবসায় লস খাই। পরে হঠাৎ গার্মেন্টসের পরিত্যক্ত এই বেল্টগুলো দেখে আমার মাথায় আসে এইগুলো দিয়েও বাঁশ বা বেতের মতো বিভিন্ন ব্যবহার্য সামগ্রী তৈরী করা সম্ভব। সেই থেকেই এই কাজের শুরু। বর্তমানে সৃষ্টিকর্তার আশির্বাদে এই ব্যবসা করে আমি এখন স্বাবলম্বী। আমার এখানে সিজনভেদে সারা বছর ৪ থেকে ৮জন শ্রমিক কাজ করে।
আমরা বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানা থেকে এই পরিত্যক্ত বেল্ট গুলো কেজি দরে কিনে আনি।
আমাদের এই শিল্পের প্রসারে যদি সরকারের রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংক কিংবা কোন বেসরকারী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করে তাহলে এই হস্তশিল্পটি আরও ব্যপকভাবে সম্প্রসারিত করা সম্ভব হবে।