এমপিও নীতিমালার নতুন ধারায় বিপাকে হাজারো সাংবাদিক শিক্ষক

আশরাফুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টার

শিক্ষা

বে-সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারী এমপিও নীতিমালার আলোকে সরকারের নিকট থেকে জাতীয় বেতন স্কেল অনুসারে মাসিক অনুদান পান।

2025-12-20T15:35:49+00:00
2025-12-20T17:43:44+00:00
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬
   
এমপিও নীতিমালার নতুন ধারায় বিপাকে হাজারো সাংবাদিক শিক্ষক
আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি
আশরাফুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: শনিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৩:৩৫ পিএম  আপডেট: ২০.১২.২০২৫ ৫:৪৩ পিএম  (ভিজিট : ২২১)
X

বে-সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারী এমপিও নীতিমালার আলোকে সরকারের নিকট থেকে জাতীয় বেতন স্কেল অনুসারে মাসিক অনুদান পান। ক্ষণে ক্ষণে পরিপত্র ও নীতিমালা জারি করে শিক্ষকদের কর্ম-বিষয়ে শর্তারোপ করে থাকে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ ‘এমপিও নীতিমালা-২০২৫’ এর একটি ধারা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এমপিও ভুক্ত হাজারো শিক্ষক-কর্মচারী। 

গত ৭ ডিসেম্বর জারি করা নীতিমালার “১১.১৭ (ক) ধারায় বলা হয়েছে এমপিওভুক্ত কোন শিক্ষক-কর্মচারী একই সাথে একাধিক কোন পদে/চাকরীতে বা আর্থিক লাভজনক কোন পদে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। এটি তদন্তে প্রমাণিত হলে সরকার তাঁর এমপিও বাতিলসহ দায়ী ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক শাস্তিমুলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। আর (খ) ধারায় বলা হয়েছে আর্থিক লাভজনক পদ বলতে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত যে কোন ধরণের বেতন/ভাতা/সম্মানী এবং বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠান/সংস্থায়/বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান/সাংবাদিকতা/আইন পেশায় কর্মের বিনিময়ে বেতন/ভাতা/সম্মানী কে বুঝাবে।” এই নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে এমপিও বাতিলের বিধান রাখা হয়েছে। 

এরফলে সারা দেশের হাজারো শিক্ষক-সাংবাদিকের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে এবং তারা এই নীতিমালাকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে নবগঠিত ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক-সাংবাদিক গ্রুপ’ সূত্রে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিসি সম্মেলনে দেওয়া প্রস্তাবের ভিত্তিতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত ১৭ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ডিসিদের মতবিনিময় সভায় যুক্তি দেওয়া হয় যে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা জাতীয় নির্বাচনে প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তারা যদি প্রকাশ্যে সাংবাদিকতা বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন, তবে সুষ্ঠু ভোট গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। তাদের নিবৃত করতে এই আইনের আর্বিভাব হয়েছে। নতুন নীতিমালায় দেশজুড়ে শিক্ষকসমাজে ব্যাপক আলোচনা- সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক প্রেস ক্লাবের সভাপতি- সাধারণ সম্পাদক শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। অনেক শিক্ষক জাতীয়-স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তাদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের পর সৃজনশীল তথা সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত থাকা কোনো দোসের না। 

নাটোরের শিক্ষক ও দৈনিক আমারদেশ প্রত্রিকার সাংবাদিক আব্দুস সালাম বলেন, বেসরকারি শিক্ষকরা অনুদানের নামে যে বেতন-ভাতা পান সেটায় সংসার খরচ মেটানো দায়। পুলিশ, বিচারক বা সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা তাদের প্রাপ্ত বেতন দিয়ে সুন্দর ভাবে সংসার চালাতে পারেন। বেসরকারি শিক্ষকদের আর্থিক সংকটের কারনেই কর্মঘন্টার পরে বিকল্প পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হন। তারা কখনোই নিজ দায়িত্বের ঘাটতি রাখেন না।

শিক্ষক ও দৈনিক দেশরুপান্তরের জেলা প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চিকিৎসকসহ অনেক পেশার মানুষ আছেন যারা কর্মঘন্টার বাহিরে ইচ্ছেমত অন্য কাজ করেন। সে বিষয়ে কোন বাধা-নিষেধ নাই। কিন্তু শিক্ষক সাংবাদিকরা নানা অনিয়ম-দূর্নীতির বিষয়ে শক্তপোক্ত নিউজ করেন। এই সাংবাদিকদের ম্যানেজ করা যায় না। তাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নাখোশ হয়েছেন। ফলে শিক্ষক-সাংবাদিকদের পথরোধে কৌশল অবলম্বন করেছেন নিজেদের নিরাপদ করতে। 

তিনি বলেন, মানুষ বোরখা ব্যবহার করে পর্দারক্ষার কাজে। কিছু মানুষ তাদের স্বার্থে এর অপব্যবহার করে বলে বোরখা নিষিদ্ধ করা যায় না। তাই নিজেদের নিরাপদ করতে দক্ষ সাংবাদিকের হাতের কলম কেড়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।

নয়া দিগন্তের জেলা প্রতিনিধি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রের এক সাধারণ নাগরিক হিসেবেও আমরা আমাদের কর্মঘন্টা বা প্রতিষ্ঠান ছুটির পর কোন কাজ করতে পারবো আর কোনটা করতে পারবো না এটা বলে দিতে পারে না। এটা রীতিমতো মানবাধিকার লংঘনের সামিল। দেশের সকল পেশাজীবি মানুষ ছুটির সময় কোন না কোন কাজ করেন। অথচ আমাদের মতো বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী নিয়ে সকলের মাথা ব্যাথা। এ অন্যায় আচরণ বন্ধ করতে হবে।  প্রতিষ্ঠানের অফিস সময়ে যত পারুন কঠোরভাবে দায়িত্ব দিন, ছুটির সময় কি করি তা নিয়ে কথা বলা উচিৎ নয়।

জাকিরুল ইসলাম নামে কুষ্টিয়ার এক শিক্ষক বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা আর্থিকভাবে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। শিক্ষকতা তাঁদের মূল পেশা এবং আয়ের উৎস হওয়ায়, তাঁরা সাংবাদিকতাকে অবৈধ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেন না। বরং তাঁরা শখের বশে, সমাজসেবার মানসিকতা নিয়ে এবং তাঁদের উন্নত ব্যক্তিত্ব ও নৈতিকতার মানদণ্ড বজায় রেখে সাংবাদিকতা করেন। এতে করে প্রকাশিত সংবাদে বস্তুনিষ্ঠতা ও নির্ভরযোগ্যতা বজায় থাকে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষকদের যুক্ততা মফস্বলের চাঁদাবাজ ও হলুদ সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। যখন স্থানীয় পর্যায়ে একজন শিক্ষিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব সাংবাদিকতা করেন, তখন তা ব্ল্যাকমেইলিং সাংবাদিকতাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয় এবং সাংবাদিকতার জগতে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। মফস্বলে এক শ্রেণির অশিক্ষিত, অযোগ্য ও চাঁদাবাজ প্রকৃতির মানুষ কেবল একটি প্রেস কার্ডের লোভে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে, যা বৈধ আয়ের লাইসেন্স না হয়ে অবৈধ ধান্দাবাজির 'লাইসেন্স' হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এদের অপকর্মে প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিকেরা প্রতিনিয়ত বিব্রত হচ্ছেন।

ইতিমধ্যে ‘বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক-সাংবাদিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গ্রুপটির আহ্বায়ক শেরপুর মডেল গার্লস কলেজের সহকারী অধ্যাপক মাসুদ হাসান বাদল জানান, সারাদেশে হাজারো শিক্ষক সাংবাদিকতায় যুক্ত রয়েছেন। তিনি দাবি করেন, সাংবাদিকতা কোনো দ্বৈত পেশা নয়। ওয়েজ বোর্ডের বিধান কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ, হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশিরভাগ মিডিয়া হাউজই কর্মীদের, বিশেষত মফস্বল সাংবাদিকদের, নামমাত্র বা কোনো বেতনই দেয় না। সর্বপরি এটা একটা কালো অধ্যায়। নীতিমালার ওইশর্ত সংবিধানের ২৬ ও ২৭ ধারার পরিপন্থি। এর সুরাহা করতে আমরা দ্রুতই আদালতের আশ্রয় নিবো। সেই প্রস্তুতি চলছে।

হাইকোর্টের আইনজীবি ব্যারিস্টার কাজী রহমান মানিক বলেন, এমপিও নীতিমালায় শিক্ষক-কর্মচারীদের দ্বৈত পেশার বিষয়ে যে শর্ত দেওয়া হয়েছে তা আরও একটু পরিস্কার করা দরকার ছিল। এখানে ঢালাও ভাবে বলা হয়েছে সাংবাদিকতা ও আইন পেশায় যুক্ত হতে পারবেন না। নির্দিষ্ট কর্মঘন্টার পরে তো প্রত্যেকটা নাগরিকের নিজস্বতা থাকতেই পারে। যে ধারা যুক্ত করা হয়েছে তা মানবাধিকার লংঘন ও সংবিধান পরিপন্থি।

এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, নীতিমালায় কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও সাংবাদিকতা ও আইন পেশাকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। যোগ্য শিক্ষকদের সাংবাদিকতার পথ বন্ধ করা হলে স্থানীয় গণমাধ্যম আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।





Loading...
Loading...


শিক্ষা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy