খালেদা জিয়া: নিঃশব্দ প্রস্থানেও ইতিহাসের বিবেক হয়ে রইলেন যিনি

মো. শফিউর রহমান, ঢাকা

মতামত

৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোরের স্তব্ধতা ভেঙে সকাল ৬টার দিকে রাজধানীর এভাকেয়ার হাসপাতালে থেমে গেল এক দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের

2025-12-31T16:33:41+00:00
2025-12-31T16:40:13+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
খালেদা জিয়া: নিঃশব্দ প্রস্থানেও ইতিহাসের বিবেক হয়ে রইলেন যিনি
মো. শফিউর রহমান, ঢাকা
প্রকাশ: বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৪:৩৩ পিএম  আপডেট: ৩১.১২.২০২৫ ৪:৪০ পিএম  (ভিজিট : ৭৩)
X

৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোরের স্তব্ধতা ভেঙে সকাল ৬টার দিকে রাজধানীর এভাকেয়ার হাসপাতালে থেমে গেল এক দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের নিঃশ্বাস। খালেদা জিয়া আর নেই। তবে এটি কেবল একজন মানুষের মৃত্যু নয় এটি একটি সময়ের সমাপ্তি, একটি সংগ্রামী জীবনের পরিসমাপ্তি, আর একই সঙ্গে একটি জাতির রাজনৈতিক বিবেকের সামনে রেখে যাওয়া গভীর প্রশ্নের শুরু।

খালেদা জিয়ার জীবন কোনো প্রস্তুত রাজনৈতিক যাত্রাপথ ছিল না। ছিল শোক থেকে শক্তিতে রূপ নেওয়ার ইতিহাস, নীরবতা থেকে নেতৃত্বে উঠে আসার সাহসী রূপান্তর। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার পর তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, বরং ইতিহাসের অনিবার্য ডাকে সাড়া দিয়ে। সেই ডাকে সাড়া দিয়েই তিনি হয়ে উঠেছিল দেশনেত্রী, গণতন্ত্রের আপসহীন কণ্ঠ, বিরুদ্ধ সময়ের দৃঢ় প্রতীক।

বাংলাদেশের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা অমোচনীয়। রাজপথের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি কখনো আপসের সহজ পথ বেছে নেননি। দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক বৈরিতা সবকিছুর মুখেও তিনি গণতন্ত্রের দাবি থেকে একচুলও সরে যাননি। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান তাঁর নেতৃত্বকে শুধু প্রতিষ্ঠিত করেনি; তাঁকে পরিণত করেছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জীবন্ত প্রতীকে।

স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে দুই স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে টানা আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগ্রাম করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। চার দশকের বেশি সময় তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ এই তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে কখনো কোনো নির্বাচনে পরাজিত না হওয়া এই দেশনেত্রী ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সফল প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং ভোটাধিকারের প্রশ্নে তিনি ছিলেন সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে আপসহীন। পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির কঠিন কাঠামোয় তিনি প্রমাণ করেছিলেন নারী নেতৃত্ব কেবল প্রতীক নয়, দৃঢ় ও কার্যকরও হতে পারে।

বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও নির্মম। দীর্ঘ কারাবাস, গুরুতর অসুস্থতা, সীমিত চিকিৎসা এই বাস্তবতা শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কষ্ট ছিল না; এটি ছিল একটি রাষ্ট্রের মানবিকতা ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের কঠিন পরীক্ষা। কারাগারের দেয়াল তাঁর আদর্শকে বন্দি করতে পারেনি। অসুস্থ শরীরেও তিনি পরাজয়ের ভাষা উচ্চারণ করেননি। নীরব সহনশীলতাই হয়ে উঠেছিল তাঁর শেষ প্রতিবাদ।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু আমাদের সামনে নতুন করে প্রশ্ন তোলে গণতন্ত্রের মূল্য আমরা কতটা বুঝি? ভিন্নমতের প্রতি আমাদের সহনশীলতা কতটা বিস্তৃত? রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি মানবিকতার সীমা অতিক্রম করতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তাঁর জীবন ও সংগ্রাম আরও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

তিনি আজ নেই। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন আপসহীন অবস্থানের স্মৃতি, রাজপথের দৃঢ় পদচিহ্ন, কারাগারের নীরব প্রতিবাদ। ইতিহাস ক্ষমতার হিসাব রাখে না; ইতিহাস রাখে অবস্থানের হিসাব। সেই বিচারে খালেদা জিয়া থাকবেন তাঁদের কাতারে, যাঁরা প্রতিকূলতার মাঝেও গণতন্ত্রের দাবি থেকে সরে যাননি।

বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্থান কয়েক যুগের অবসান। তবু তাঁর জীবন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় গণতন্ত্র কখনো দানে পাওয়া যায় না; একে অর্জন করতে হয়, রক্ষা করতে হয়, আর কখনো কখনো নিঃশব্দ কষ্ট বুকে নিয়েও ধরে রাখতে হয়।

বেগম খালেদা জিয়া চলে গেলেন।

কিন্তু হার না মানা সংগ্রামের নামটি রয়ে গেল ইতিহাসের পাতায়, মানুষের স্মৃতিতে, গণতন্ত্রের প্রশ্নে।






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy