মানবতার সেবায় দীর্ঘ ২৫০ বছর যাবত নিয়োজিত হোমিওপ্যাথিক

    
শুক্রবার ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১০ মাঘ ১৪৩২
শুক্রবার ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
মানবতার সেবায় দীর্ঘ ২৫০ বছর যাবত নিয়োজিত হোমিওপ্যাথিক
ডাঃ নজরুল ইসলাম ভূইয়া, বিএসসি, বিএইচএমএস (ঢাকা বিশ্বঃ)
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১১:৩৫ AM আপডেট: ৩০.১২.২০২৫ ৪:৪৪ PM (Visit: 1075)

দীর্ঘ ২৫০ বছর পরেও বিশ্বব্যাপি সমাদৃত এবং WHO কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এ চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে সরকার এবং বিএমডিসি অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। এমবিবিএস ও বিডিএস ডিগ্রিধারী ব্যতিরেকে অন্য কোন বিকল্প চিকিৎসার সাথে জড়িতদের নামের আগে "ডাঃ (ডাক্তার)" পদবী ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে জারিকৃত নির্দেশনা স্থগিত করেছে হাইকোর্ট। 

একই সাথে এ নির্দেশনা কেন আইনবহির্ভূত ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তার কারণ জানাতে চার সপ্তাহের মধ্যে বিবাদীদের প্রতি রুল জারি করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের শুনানি গ্রহণ করে বিচারপতি ফয়েজ আহমেদ এবং বিচারপতি মো. মনজুর আলম সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ এ আদেশ দেন। প্রসঙ্গত, গত ১০ আগস্ট স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের উপসচিব রাহেলা রহমত উল্লাহর স্বাক্ষরে ন্যূনতম এমবিবিএস ও বিডিএস ডিগ্রিধারী ব্যতিরেকে অন্য কেহ তাদের নামের পূর্বে ‘ডাক্তার’ পদবী ব্যবহার করতে পারবেন না বলে নির্দেশনা জারি হয়। 

এতে বলা হয়, “স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাসমূহে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০ ও হাইকোর্টের (রিট পিটিশন নং-২৭৩০/২০১৩ ও ১৩০৪৬/২০২৪) রায় অনুযায়ী এমবিবিএস ও বিডিএস ডিগ্রিধারী ব্যতীত অন্যান্য পেশাজীবীদের (হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদিক ও ইউনানী) নামের পূর্বে ‘ডাক্তার (ডা.)’ পদবী ব্যবহার না করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।” 

এ নির্দেশনাকে চ্যালেঞ্জ করে হোমিওপ্যাথিক ডিগ্রী (বিএইচএমএস) কোর্স বাস্তবায়ন পরিষদের সাবেক সভাপতি ও সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের সাবেক সহকারী অধ্যাপক ডাঃ মো. নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া এবং হোমিওপ্যাথিক ওষুধ আমদানি ও রপ্তানিকারক এসোসিয়েশনের সভাপতি ডাঃ নূরুজ্জোহা বাদী হয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশনটি (নং-১৯৮৮০/২০২৫) দায়ের করেন। রিট আবেদনে বলা হয়, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা বিজ্ঞান হলো একটি প্রাচীনতম এবং বিশ্বজুড়ে প্রচলিত স্বীকৃত বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি। বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন, ২০২৩-এর মাধ্যমে এ চিকিৎসা সেবা পরিচালিত হয়ে আসছে। জাতীয় সংসদে পাসকৃত এ আইন-এর  ২ (১৩) ধারা অনুযায়ী হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকগণের নামের আগে “ডাক্তার”উপাধি ব্যবহার আইনসিদ্ধ। সরকার এ আইনের আলোকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আপাতত ‘হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিল’ গঠন করেছে।

তাছাড়া ভেটেরিনারি কাউন্সিল আইন, ২০১৯; ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ এর ২(১২) ধারা সহ পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলংকা, দক্ষিণ আফ্রিকা সহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি আইন অনুযায়ী সরকার স্বীকৃত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকগণ নামের পূর্বে ‘ডাক্তার’ উপাধি ব্যবহারে আইনগতভাবে অধিকারপ্রাপ্ত।

অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় হাইকোর্টের যে রায়ের উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে, সেই মামলা ২ টির রায়ে এধরনের কোন নির্দেশনা নেই। অন্যদিকে, রিট ৫৩৫/২০১৯ এর রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকগণ বিএমডিসি আইন ২০১০ অনুসারে তাদের নামের পূর্বে ডাঃ পদবী ব্যবহার করতে পারবে না। 

উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে তৎকালীন হোমিওপ্যাথিক বোর্ড এবং অন্যান্য হোমিওপ্যাথিক সংগঠন মহামান্য আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (মামলা নং ১৯৫৫/২০২১, ১৯৩৯/২০২১, ১৯৫১/২০২১, ১৮২৬/২০২১ এবং ১৯৯২/২০২১) মামলা দায়ের করেছে। আপিল বিভাগ নিম্ন আদালতের রায়ের প্রতি ভৎসনা জ্ঞাপন করে তাদের সিভিল আপিল মামলাগুলো মঞ্জুর করেছে যা অদ্যবধি বিচারাধীন রয়েছে। অথচ সরকার বিচারাধীন বিষয়ে চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা না করে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকগণের নামের পূর্বে "ডাক্তার (ডাঃ)" পদবী ব্যবহারের বিষয়ে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন তা মোটেই আইন সঙ্গত নয় এবং এটা সর্বোচ্চ আদালতকে অবমাননার শামিল এবং মহান জাতীয় সংসদকেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবমাননা করেছে। 

এদিকে গত ২৯/০৮/২০২৪ ইং তারিখে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকগণ নামের পূর্বে "ডাঃ (ডাক্তার)" পদবী ব্যবহার প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার ডাঃ মোঃ জাহাঙ্গীর আলম এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বলেন, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিল আইনের ধারা ২(১৩) ও ০৩ অনুসারে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকগণ নামের পূর্বে "ডাঃ (ডাক্তার)" পদবী ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ করেন। 

রীট পিটিশন ৫৩৫/২০১৯ এ মহামান্য হাইকোর্টের বিচারপতিগণ তাঁদের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন, "বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হোমিওপ্যাথি যা ১৭৯৬ সালে উদ্ভাবন করেন জার্মান দেশীয় এলোপ্যাথিক চিকিৎসক ডাঃ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান। রোগীকে অল্প ঔষধ দিয়ে সুস্থ করে তোলাই হোমিওপ্যাথির মূলমন্ত্র।" তাঁরা আরো বলেন, "পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ বিকল্পধারার চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে বিকল্পধারার বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতিকে আইন ও বিধিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে। WHO এর ১৯৪ টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৭৯ টি সদস্য রাষ্ট্র বিকল্পধারার চিকিৎসা পদ্ধতির আইন ও নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো প্রণয়ন করেছে। পৃথিবীর অনেক দেশ ইতোমধ্যেই বিকল্পধারার চিকিৎসা পদ্ধতিকে মূল ধারার চিকিৎসায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।" বিচারপতিগণ উক্ত মামলার রায়ে Ministry of AYUSH, Government of India এর আদলে বাংলাদেশে একটি পৃথক মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন।" 

বার্ডেমের প্রতিষ্ঠাতা জাতীয় অধ্যাপক ড. এম ইব্রাহিমের নেতৃত্বে গঠিত ৮ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি (যেখানে পাঁচজনই বিশ্বমানের এ্যালোপ্যাথিক অধ্যাপক ছিলেন) রির্পোটের ভিত্তিতে ১৯৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের শিক্ষা কারিকুলামে MMBS এর সমমানের হোমিওপ্যাথিক বিএইচএমএস কোর্সকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দুইটি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ (একটি সরকারি ও একটি বেসরকারি) এবং বর্তমানে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিল কর্তৃক ৬৬ টি ডিপ্লোমা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ পরিচালিত হয়ে আসছে যা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিল আইন ২০২৩ অনুসারে পরিচালিত হয়ে আসছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০-এর কোনো যোগসূত্র কিংবা সম্পৃক্ততা নেই। অথচ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০-এর দোহাই দিয়ে অন্যান্য বিকল্প চিকিৎসাকে বেআইনিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। 

হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ আবেদনের যথার্থতা অনুধাবন করেই মন্ত্রণালয়েরর নির্দেশনার কার্যকারিতা ১৭/১২/২০২৫ ইং তারিখ হতে পরবর্তী তিন মাসের জন্য স্থগিত এবং রুল জারি করেছেন। বাদী পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেছেন ব্যারিস্টার আশিকুর রহমান এবং সরকার পক্ষে জনাব নূর মোহাম্মদ আজমি গং।

সংশ্লিষ্টরা আরো বলেছেন, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকগণ যাতে নামের পূর্বে "ডাক্তার (ডাঃ)" পদবী ব্যবহার করতে না পারেন এজন্য বিএমডিসি কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত দুরভিসন্ধিমূলক ভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে অধ্যাদেশ আকারে বিএমডিসি আইন ২০২৫ সংশোধন করতে চাচ্ছে। আর তা যদি বাস্তবায়ন করতে সরকার পদক্ষেপ নেয় তাহলে মহামান্য হাইকোর্ট, মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট এবং WHO কে অবমাননা করা হবে বলেই তারা মনে করেন। হোমিওপ্যাথিক স্বার্থ সংরক্ষণ জাতীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ গত ০২/০৯/২০২৫ ইং তারিখে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথিতে ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজার এবং বিএইচএমএস চিকিৎসক প্রায় আড়াই হাজার, দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে প্রায় দ্ইুশত জন চিকিৎসক কর্মরত এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিটি শাখায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকগণ কর্মরত। হোমিওপ্যাথিক ঔষধশিল্প ও ব্যবসার সাথে প্রায় দুই লক্ষ মানুষ কর্মরত যাদের নিয়ন্ত্রণ করেন সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিল, ড্রাগ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। 

এ পেশার অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং চিকিৎসা সেবার গুরুত্ব অনুধাবন করে অনতিবিলম্বে পেশার সাথে সম্পৃক্ত সর্বোচ্চ ডিগ্রি প্রাপ্ত একজন যোগ্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসককে চেয়ারম্যান করে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিল গঠন করার জোর দাবি জানিয়েছেন। যদিও আইন পাশ হওয়ার দুই বছর অতিবাহিত হলেও সরকার এখন পর্যন্ত কোন রহস্যজনক কারনে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করেনি তা চিকিৎসক সমাজের নিকট আতঙ্কের বিষয়। 

১৯৮১ সনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা বিজ্ঞানকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে দেশে একটি সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং ৩টি সরকারি হোমিওপ্যাথিক ডিপ্লোমা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য ১০কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিলেন যা দ্বিতীয় পাঁচশালা পরিকল্পনায় N.E.C কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে। বর্তমানে কলেজটিতে ছত্রিশতম ব্যাচ অধ্যায়নরত।







  সর্বশেষ সংবাদ  


  সর্বাধিক পঠিত  


এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক:
মো. আশরাফ আলী
কর্তৃক এইচবি টাওয়ার (লেভেল ৫), রোড-২৩, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২।
মোবাইল : ০১৮৪১০১১৯৪৭, ০১৪০৪-৪০৮০৫৫, ই-মেইল : thebdbulletin@gmail.com.
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy