বিশ্ব যখন নারীশিক্ষা ও সমঅধিকারের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আফগানিস্তানে নারীদের জন্য শিক্ষা যেন এক নিষিদ্ধ স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালে তালেবান সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আসার পরপরই মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত শুধু আফগান নারীদের মৌলিক অধিকার হরণই নয়, বরং গোটা জাতির ভবিষ্যতের জন্য এক অশনি সংকেত।
তালেবানদের মতে, মেয়েদের শিক্ষার পরিবেশ এখনও যথাযথভাবে ইসলামসম্মত নয়, তাই তারা পর্দা ও সামাজিক ব্যবস্থার অজুহাতে মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ রেখেছে। যদিও ইসলাম ধর্মে জ্ঞানার্জনকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ফরজ করা হয়েছে, তথাপি আফগানিস্তানের বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত।
অনেক অভিভাবকই মনে করেন, ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী পর্দার বিধান বজায় রেখে শিক্ষার ব্যবস্থা করা সম্ভব। এক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা ক্লাসরুম, নারী শিক্ষিকা নিয়োগ, এবং অনলাইন শিক্ষার বিকল্প ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। কিন্তু তাও বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
বিশ্বের অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশ যেমন বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, এমনকি সৌদি আরবেও মেয়েরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে এবং সমাজে সফলতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আফগানিস্তান যদি এ পথ অনুসরণ না করে, তবে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পশ্চাৎপদ বলেই বিবেচিত হবে।
যে জাতি তার অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত রাখে, সেই জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার ছাড়া কিছুই হতে পারে না। আফগানিস্তানে নারীদের শিক্ষা বন্ধ থাকলে আগামী দিনে সেখানে দক্ষ জনশক্তির সংকট তৈরি হবে, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা বা প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে নারী-অংশগ্রহণ থাকবে না। অর্থনীতিতে উৎপাদন কমবে, পরিবারে দারিদ্র্য বাড়বে, এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটি আরও একঘরে হয়ে পড়বে।
শুধু তাই নয়, শিক্ষা বঞ্চিত একটি প্রজন্ম সমাজে চরমপন্থা, সহিংসতা ও পশ্চাৎপদ চিন্তার বিস্তার ঘটাতে পারে। আফগানিস্তানের মতো একটি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের জন্য যেখানে প্রতিটি মানুষের দক্ষতা প্রয়োজন, সেখানে নারীদের বাইরে রাখা মানে পুরো জাতিকেই দুর্বল করে ফেলা। এভাবে চলতে থাকলে আফগানিস্তান ভবিষ্যতে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রই নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
আফগানিস্তান যদি মেয়েদের শিক্ষার পথ আবার খুলে দেয়, তবে তা শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নেই সাহায্য করবে না, বরং গোটা বিশ্বের সামনে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে। তখন আফগানিস্তানকে আর পশ্চাৎপদ ও রক্ষণশীল দেশ হিসেবে দেখা হবে না, বরং তারা ইসলামি মূল্যবোধের ভেতরে থেকেই মানবাধিকার নিশ্চিত করার উদাহরণ হয়ে উঠতে পারবে।
বিশ্ববাসীর মনে ইসলাম সম্পর্কে যে ভুল ধারণা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে, তা দূর হবে। মানুষ বুঝবে—ইসলাম নারীশিক্ষার বিরোধিতা করে না, বরং জ্ঞান অর্জনকে ফরজ বলে গণ্য করে। তখন ইসলাম ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও আগ্রহ বিশ্বব্যাপী আরও বাড়বে।
গোলাম মোস্তফা
ইংরেজি ভাষা সাহিত্য বিভাগ
নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।