
X
দেশের শস্য ভান্ডার ও আমের রাজ্য সীমান্তবর্তী জেলা নওগাঁয় অবৈধ ইট ভাটায় পুড়ছে কাঠ পরিবেশ হচ্ছে বিপন্ন, পাশাপাশি ইট ভাটার কালো ধোঁয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। সেই সাথে ভবিষ্যতে এই জেলায় খাদ্য ঘাটতির প্রচন্ড আশঙ্কা রয়েছে, তাই পরিবেশ বিপর্যয়রোধে দ্রুত কার্যকরী আইনি পদক্ষেপের কথা বলছেন জেলার পরিবেশবাদীরা।
উত্তরের জেলা নওগাঁর অবৈধ ইট ভাটা গুলোতে নীতিমালার কোন তোয়াক্কা না করে অবাধে চলছে বনজ ও ফলক গাছ পোড়ানোর মহাউৎস, অন্যদিকে আবার জেলায় অবৈধ ও অসাধু ইট ভাটা মালিকরা মেতে উঠেছে ফসলি জমির মাটি কাটা নিয়ে। কৃষকের ৩ ফসলি জমির শ্রেণী পরিবর্তন না করে ভূমি অফিস অথবা প্রশাসনের কোনো অনুমতি ছাড়াই মাটির প্রাণ টপ-সয়েল কেটে পুকুর খনন করে মাটি গুলো জেলা উপজেলায় তাদের ইটের ভাটায় নিয়ে যাচ্ছে । এতে করে যেমন পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে অন্যদিকে কমছে ফসলি জমি যার প্রভাব পড়ছে খাদ্য উৎপাদনে। ২০১৩ ও ২০১৯ এর ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইনে বিশেষ কোনো স্থাপনা, রেলপথ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা অনুরূপ কোনো স্থান বা প্রতিষ্ঠান থেকে কমপক্ষে ১ কিলোমিটার দূরে ইটভাটা স্থাপনের কথা বলা হলেও মানা হয়নি এর কোনোটিই। এদিকে ২০২৩ এর সংশোধিত আইনের ধারা মতে টপ- সয়েল কাটলে ২ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থ দন্ড রয়েছে। এবং জেলা সদর, উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন পর্যায়ে অবৈধ কোন ইট ভাটা থাকবে না বলে উল্লেখ আছে।
অবৈধ এই ভাটা গুলোর খুব কাছেই আছে কলেজ, মাধ্যমিক স্কুল, প্রাথমিক স্কুল ও মাদ্রাসা। এগুলোও আবার অর্ধ কিলোমিটার দূরত্বের ভেতরে অবস্থিত। এসব প্রতিষ্ঠানে কোমলমতি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ লক্ষ হবে। অবৈধ ইট ভাটার কালো ধোঁয়ার ফলে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে এই সব শিক্ষার্থীরা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী জেলায় মোট ইট ভাটা রয়েছে ১৫১টি এরমধ্যে বৈধ-২৫ টি, অবৈধ-১২৬ টি ইট ভাটায় চলছে কাঠ পোড়ানোর মেলা। চলতি মাসে রাণীনগর উপজেলায় সকল অবৈধ ইট ভাটা থাকলেও শুধু সাবেক আওয়ামী লীগের রাণীনগর, আত্রাই আসনের এমপি হেলালের ২ টি অবৈধ ইট ভাটায় প্রায় দেড় লক্ষ টাকা জরিমানা করেছে। এতে সাধারণ জনগণের ধারণা এগুলো শুধু মাত্র আই ওয়াস মানুষকে দেখানো মাত্র। রাণীনগর সব ইট ভাটা অবৈধ কিন্তু কোন অবৈধ ইট ভাটায় অভিযান পরিচালনা না করে শুধু এমপি হেলালের ২ টিই অবৈধ ইট ভাটা রয়েছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার পিভিসি ইট ভাটার মালিক আবুল কালাম আজাদ ফোনে বলেন, আমার ইট ভাটার সাথে লাগানো নতুন একটি কোল্ডষ্টোর তৈরি করছি যাহার সনদপত্র আমার আছে। ইট ভাটার সাথে লাগানো কোল্ডষ্টোর থাকা চলবে না এটা আমার জানা নেই। আপনারা নিউজ করলে করতে পারেন বলে ফোন কেটে দেয়।
নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার ইট ভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আখরাজুল চৌধুরী ফোনে বলেন, আমরা আমাদের সমিতির মাধ্যমে উপজেলার প্রতিটি অবৈধ ইট ভাটা থেকে কিছু টাকা পুলিশ, প্রশাসন ও সাংবাদিকদের জন্য চাঁদা তুলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের দায়িত্বরত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে তুলে দিয়ে থাকি এটা তো কোন অন্যায় নয় বলে ফোন কেটে দেয়।
জেলা ইট ভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিঠু হোসেন সাংবাদিকদের বলছেন, বৈধ ইট ভাটা থেকে ১ লক্ষ টাকা জেলা প্রশাসক ও পরিবেশ অধিদপ্তর কে দিয়ে থাকি। আর অবৈধ ইট ভাটা থেকে প্রতি বছর প্রথম কিস্তি হিসেবে ১৬ এ ডিসেম্বর খরচ বাবদ প্রতিটা ইট ভাটা থেকে ৭৫ হাজার টাকা ও দ্বিতীয় কিস্তি হিসেবে ২৬ শে মার্চ ৭৫ হাজার টাকা করে মোট দেড় লক্ষ টাকা পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনকে আমরা সন্মানী হিসেবে দিয়ে থাকি।
নওগাঁর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নাজমুল হোসাইন সাংবাদিকদের মুল প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বলেন,আমরা ইতি মধ্যে বেশ কয়েকটি উপজেলায় অবৈধ ইট ভাটার অভিযান পরিচালনা করেছি। এতে অনেক অবৈধ ইট ভাটায় জরিমানা ও উচ্ছেদ কাজ চালু রয়েছে। তারপরও আমরা আমাদের ঊর্ধ্বতম কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানিয়েছি, জেলার প্রতিটি অবৈধ ইট ভাটা গুলোর নাম ধরে ধরে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
এবিষয়ে নওগাঁ জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলামও সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে বলছেন, আমরা কোন ইট ভাটা থেকে টাকা পয়সা চাঁদা নিয়ে থাকি না, আমরা আমাদের অভিযান পরিচালনা প্রতিনিয়ত চালু রেখেছি। একটি ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা একসাথে সকল অবৈধ ইট ভাটায় অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব নয়, তাই একটু সময় নিয়েই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে এর বাহিরে ঢাকা থেকে ম্যাজিস্ট্রেট আসলে মোবাইল কোটের মাধ্যমে ইট ভাটায় জরিমানা, উচ্ছেদ, অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
জেলার মানুষদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে এবং আগামীতে যেনো খাদ্য সংকট না তৈরি হয় সেই দিক লক্ষ্য রেখে অবৈধ সকল ইট ভাটা গুলোর বিরুদ্ধে খুব দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সচেতন মহল।