
X
আর মাত্র তিন দিন পরই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, বগুড়ার সাতটি আসনে ততই স্পষ্ট হচ্ছে ভোটের বাস্তব সমীকরণ। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে উঠে এসেছে নারী ভোট। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ ভোটার তালিকা অনুযায়ী, বগুড়ার প্রায় সব আসনেই পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি। ফলে এই নারী ভোট যার পক্ষে যাবে, তারাই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে থাকবে এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বগুড়া বরাবরই বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। দলটি এবারও তাদের ঐতিহ্যগত অবস্থান ধরে রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে বগুড়ায় একটি আসনও ছাড় দেওয়ার প্রশ্ন নেই।
বগুড়া-৬ (সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী তারেক রহমান ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন। তার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী থেকে প্রার্থী হয়েছেন মো. আবিদুর রহমান।
বিএনপির দাবি, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মভূমি হিসেবে এই আসনে ধানের শীষের প্রতি ভোটারদের আবেগ এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনে বিএনপির প্রার্থী গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ এবং জামায়াতের দবিরুর রহমান এর মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। এখানে নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ভোটের মাঠে বাড়তি উত্তাপ তৈরি করেছে।
এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী বগুড়ায় কমপক্ষে তিনটি আসন জয়ের আশাবাদ ব্যক্ত করছে। দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ), বগুড়া-৩ (দুপচাঁচিয়া-আদমদীঘি) এবং বগুড়া-৪ (নন্দীগ্রাম-কাহালু) এই তিনটি আসন তাদের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময়।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংসদ নির্বাচনে এই দুটি আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার নজির রয়েছে। সেই ইতিহাস, স্থানীয় সাংগঠনিক ভিত্তি এবং পুরনো ভোট ব্যাংকের ওপর ভর করেই দলটি এবারও বড় প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নেমেছে।
বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ শাহাদাতুজ্জামান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির মীর শাহে আলম এবং নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে। এখানে ত্রিমুখী লড়াই হলেও জামায়াত মনে করছে, অতীতের ভোট কাঠামো তাদের পক্ষে যেতে পারে।
বগুড়া-৩ (দুপচাঁচিয়া-আদমদীঘি) আসনে জামায়াতের নূর মোহাম্মদ বিএনপির আব্দুল মহিত তালুকদার এর বিপরীতে শক্ত অবস্থান গড়ার চেষ্টা করছেন। বগুড়ার এ আসনের জামায়াতের প্রার্থী শিক্ষা দীক্ষায় ভাল। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে জামায়াতের প্রার্থী সুনাম অর্জন করেছেন।
বগুড়া-৪ (নন্দীগ্রাম-কাহালু) আসনে জামায়াত প্রার্থী মোস্তফা ফয়সাল মুখোমুখি হচ্ছেন বিএনপির মোশারফ হোসেন এর। জামায়াতের দাবি, এই আসনেও তাদের অতীত সাংগঠনিক উপস্থিতি এখনো ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, জামায়াতের ভোট কিছুটা বাড়তে পারে, কিন্তু তা আসন জয়ে রূপ নেওয়ার মতো নয়। কারণ শেষ মুহূর্তে বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোট, শহীদ জিয়ার নাম ও ধানের শীষের প্রতি আবেগ একত্রিত হলে ফলাফল বিএনপির পক্ষেই যাবে।
বগুড়া জিয়া পরিষদের সাবেক সাধারন সম্পাদক দৈনিক ইনকিলাব এর ব্যুরো প্রধান মহসীন আলী রাজু বলেন, “বগুড়ার মানুষ সংকটের সময়ে ধানের শীষেই আস্থা রেখেছে। শেষ দিনে ভোট এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে নারী ভোটাররা শুধু দলীয় পরিচয় নয়, জীবনযাত্রার বাস্তব সংকট বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। দ্রব্যমূল্য, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ এই বিষয়গুলোই তাদের ভোট আচরণ নির্ধারণ করছে। সব মিলিয়ে বগুড়ার সাতটি আসনে নির্বাচন এখন তিন স্তরের লড়াই একদিকে বিএনপির দুর্গ রক্ষার লড়াই।
অন্যদিকে জামায়াতের ঐতিহাসিক আসন পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা নারী ভোটারদের নীরব কিন্তু নির্ধারক সিদ্ধান্ত।
ভোটের দিন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউই নিশ্চিতভাবে ফল বলছে না। তবে এটা স্পষ্ট, বগুড়ার ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে বড় বার্তা দেবে।