
X
আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর এটি প্রথম জাতীয় নির্বাচন এবং প্রায় দুই দশকের মধ্যে এটিই প্রথম নির্বাচন, যেখানে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল রোডে ক্যাসাব্লাংকা ক্যাফের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে কাঁচের কাউন্টারের পেছনে রাখা সিঙ্গারা, বিরিয়ানি আর হ্যাশ ব্রাউন। বন-সবুজ রঙের পোলো শার্ট পরা দুই কর্মী গ্রিল আর ক্যাশ কাউন্টারের মধ্যে দ্রুত চলাফেরা করছেন। দুপুরের সময় ভিড় একটু বাড়ে, আবার কমে। বাইরে ট্রাফিকের শব্দ আর মাঝে মাঝে ভেসে আসা সাইরেনের আওয়াজের সঙ্গে ভেতরের কথাবার্তা আর চেয়ার টানার শব্দ মিশে যায়। এই ক্যাফের মাঝখানের একটি পুরোনো কাঠের টেবিলে বসে আছেন খালেদ নূর। হাতে আদা ও মধু মেশানো চা। তিনি একজন ব্যারিস্টার ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষক। কথা বলতেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা এখানে মাসের পর মাস ধরে থামছেই না। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই মানুষ এটা নিয়েই কথা বলছে বলে জানান তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রিত ভোট, বিরোধীদের বর্জন এবং দমন-পীড়নের অভিযোগে দেশের ভেতরে যেমন ভোটারদের আগ্রহ কমে গিয়েছিল, তেমনি বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের মাঝেও তৈরি হয়েছিল তীব্র হতাশা। এছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে দুই প্রধান দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবর্তিত ছিল, আর তা হলো- শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
বিএনপি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে অনেকটাই কোণঠাসা ছিল। এখন দলটি আবার সক্রিয় হচ্ছে খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে। ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানো তারেক রহমানকে সমর্থকেরা একদলীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখেন, আবার সমালোচকেরা তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অতীত মামলার প্রসঙ্গ তোলেন। এই নির্বাচনটি খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর প্রথম, ফলে আবেগগত ও প্রতীকী গুরুত্বও আলাদা।
এরই মধ্যে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে নির্বাচনি রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করেছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে এই পটভূমিতে সব থেকে আলোচিত বিষয়, বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার পেয়েছেন। খালেদ নূর বলেন, আমরা বহু বছর ধরে এটার জন্য আন্দোলন করেছি, মানুষ চেয়েছে স্বীকৃতি।
তবে ক্যাফের আশপাশের টেবিলে বসা অনেকেই প্রকাশ্যে রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে চান না। খালেদ নূরের মতে, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত কিছু বাংলাদেশি, যাদের অভিবাসন-সংক্রান্ত অবস্থান পুরোপুরি নিরাপদ নয়, তারা বিশেষভাবে সতর্ক। তারা সবকিছু খেয়াল করছেন।
দশকের পর দশক ধরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতিবছর দেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠালেও জাতীয় নির্বাচনে তাদের কোনো ভোটাধিকার ছিল না। অনেকেই মনে করতেন, এই বঞ্চনা শুধু অগণতান্ত্রিকই নয়, রাজনৈতিকভাবেও সুবিধাজনক, কারণ বিদেশে থাকা বহু বাংলাদেশি রাজনৈতিক সহিংসতা বা দমনের কারণে দেশ ছেড়েছিলেন।
দীর্ঘ চাপের মুখে নির্বাচন কমিশন প্রবাসীদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের সুযোগ দেয়। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, সারা বিশ্বে সাত মিলিয়নের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি ইতিমধ্যে নিবন্ধিত হয়েছেন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৫ শতাংশ। ধারণা করা হয়, মোট প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি।
কিন্তু যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা মাত্র ৩২ হাজারের কিছু বেশি, যা এখানকার বিশাল বাংলাদেশি কমিউনিটির তুলনায় খুবই কম। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ৬ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ নিজেদের বাংলাদেশি বা ব্রিটিশ বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় এই হার প্রায় ৩৫ শতাংশ। এই ব্যবধানটি একটি গভীর বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়, সাংস্কৃতিক পরিচয় আর নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকার সব সময় এক নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, কাছাকাছি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে প্রবাসী ভোটাররা ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারেন। কিছু আসনে বিদেশে নিবন্ধিত ভোটাররা মোট ভোটারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত হতে পারেন। প্রথম-পাস্ট-দ্য-পোস্ট পদ্ধতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ভোট দিতে হলে অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) থাকতে হয়। যুক্তরাজ্যে জন্ম নেয়া বা বেড়ে ওঠা অনেক ব্রিটিশ বাংলাদেশি সাংস্কৃতিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও নাগরিকত্বের কাগজপত্র না থাকায় ভোট দিতে পারেন না।
হোয়াইটচ্যাপেল রোড মার্কেটে দুই তরুণী রঙিন পোশাক দেখছিলেন। নির্বাচনের কথা তুলতেই তারা জানালেন, এটা তো আমাদের ওপর প্রভাব ফেলে না, তাই না?’ তাদের কাছে ব্রিটিশ রাজনীতি, লেবার পার্টির সংকট বা রিফর্ম পার্টির উত্থান বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
খালেদ নূরের মতে, তরুণ ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের মধ্যে এই অনাগ্রহ খুব সাধারণ। দীর্ঘদিনের বিতর্কিত নির্বাচন তাদের আস্থা নষ্ট করেছে। তার ওপর আছে বাস্তব বাধা- এনআইডি, বায়োমেট্রিক্স, মোবাইল অ্যাপের ঝামেলা। বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য এটা খুব কঠিন। এর বিপরীতে, সৌদি আরব বা কাতারের মতো দেশে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা অনেক বেশি। কারণ সেখানে থাকা বাংলাদেশিরা সাধারণত অস্থায়ী শ্রমিক, যাদের পরিবার দেশে থাকে এবং বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সরাসরি।
টাওয়ার হ্যামলেটসের একটি কমিউনিটি সেন্টারে চা-বিস্কুটের আড্ডায়ও নির্বাচন আলোচনায় আসে। কেউ ভোট দিয়েছেন, কেউ দিতে পারেননি, কেউ আশাবাদী, কেউ আবার সন্দিহান। জাহানারা বেগম, যিনি সদ্য ব্রিটেনে এসেছেন, প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পেরে উচ্ছ্বসিত। অনেক বছর পর মনে হচ্ছে ভোটটা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, বলেন তিনি। তার চার সন্তান বাংলাদেশে থাকে। অন্যদিকে, তার মেয়ে নার্গিস আখতার ভোট দেননি। তার বিশ্বাস, শুধু নির্বাচনেই পরিবর্তন আসে না। প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, কর্মসংস্থান আর সুরক্ষা না থাকলে ভোটে কী বদলাবে?
অর্থাৎ ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে নির্বাচনের প্রতি মনোভাব একরকম নয়। কারও কাছে এটি স্মৃতি, পরিচয় আর দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন; কারও কাছে দূরের এক রাজনীতি, যা দৈনন্দিন জীবনে তেমন প্রভাব ফেলে না।
তবু একটি বিষয় পরিষ্কার, তা হলো- প্রথমবারের মতো প্রবাসী ভোটাধিকার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় খুলেছে। এই ভোট কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। কিন্তু অনেকের কাছে, বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছেন, এই সুযোগের প্রতীকী গুরুত্ব অপরিসীম। খালেদ নূর বলেন, হয়তো সংখ্যায় আমরা কম, কিন্তু এই ভোটটা অন্তত প্রমাণ করে আমাদের কথাও এখন গুরুত্ব রাখে।