
X
এখানকার পুরোনো মানুষদের চোখেমুখে বনেদি অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। চট্টগ্রাম নগরীর জায়গাটার নাম খলিফাপট্টি। তবে স্থানীয়ভাবে এটি দরজিপাড়া নামেও পরিচিত।
১৯৪৭ সালে আইয়ুব আলী নামের একজন দরজি তাঁর কয়েকজন সাগরেদ নিয়ে আন্দরকিল্লা মোড়সংলগ্ন ঘাট ফরহাদবেগে সেলাইয়ের কাজ শুরু করেছিলেন। সাত দশকের পরিক্রমায় জায়গাটি খলিফাপট্টি নামে বিখ্যাত হয়ে গেছে। ঢাকার ইসলামপুর ও চট্টগ্রামের টেরিবাজার থেকে থান কাপড় এনে নিজস্ব নকশায় সব বয়সের মানুষের চাহিদা অনুযায়ী পোশাক তৈরি হয় খলিফাপট্টিতে।
চট্টগ্রাম নগরীর খলিফা পট্টিতে এখন ব্যস্ততার অন্ত নেই। দর্জিবাড়ির এসব কারখানায় নির্ঘুম রাত কাটছে এই পেশার সংশ্লিষ্টদের। নগরীর সিরাজদৌল্লা রোডের সাব এরিয়া বাজার সংলগ্ন খলিফাপট্টিতে বর্তমানে দিন রাত সেলাই মেশিনের খটখট শব্দের সাথে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। সাধারণত রমজান শুরুর দুই সপ্তাহ আগে দর্জিদের ব্যস্ততা শুরু হয়। খলিফাপট্টির দর্জিরা শার্ট, প্যান্ট, থ্রিপিস, লেহেঙ্গা ও স্কার্ট তৈরি করে নগরী এবং এর বাইরের বিভিন্ন মার্কেটে পাইকারীতে বিক্রি করেন। এছাড়া অগ্রিম অর্ডার নিয়ে খলিফাপট্টির দর্জিরা কাজ করেন বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে খলিফাপট্টি ঘুরে দেখা গেছে, শ্রমিকদের কেউ কাপড় কাটছেন, কেউ সেলাই করছেন, কেউ আবার সেলাই করার কাপড়ে নানা ধরনের পুঁতি ও লেইচ সংযুক্ত করছেন। খলিফাপট্টির কারখানাগুলোতে সর্বনিম্ন ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকার জামাও তৈরি হচ্ছে। দেশি ছাড়াও বিদেশি বিভিন্ন বাহারি ডিজাইনের থ্রিপিস, লেহেঙ্গা, স্কার্ট ও প্যান্ট তৈরি করে থাকেন খলিফাপট্টির ডিজাইন মাস্টাররা।
সালাউদ্দিন নামের একজন দর্জি জানান, এই সময়ে অনেকে জামা অর্ডার করছেন। তাই কাজের চাপও একটু বেশি। খলিফাপট্টির ব্যবসায়ীরা সারা বছর রমজানের ঈদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এখানে সারা বছর যত কাজ হয়, তার ৮০ শতাংশ কাজ হয় ঈদকেন্দ্রিক।
নুরুল আমিন খোকন নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, দূরদূরান্ত থেকে পাইকারী ব্যবসায়ীরা পোশাক নিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের দর্জিরা সারারা, গারারা, নায়রা ও লেহেঙ্গা তৈরিতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন। খলিফাপট্টিতে পোশাকের চাহিদা এখন চট্টগ্রাম শহর ও বিভিন্ন উপজেলা ছাড়িয়ে বিভিন্ন জেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
খলিফাপট্টি বণিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইমাম হোসেন বলেন, খলিফাপট্টিতে এখন রাতদিন দর্জি শ্রমিকদের ব্যস্ততা চলছে, এখানে অগ্রিম অর্ডার নিয়েও কাজ করা হয়। আমাদের দর্জিরা সুলভ মূল্যে বাহারি ডিজাইনের জামা তৈরি করেন। বাজারে বিদেশী পোশাকের আগ্রাসনের মধ্যে আমাদের প্রতিযোগিতা করে টিকতে হচ্ছে।
১৯৪৭ সালের দিকে আইয়ুব আলী নামের নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের এক ফেরিওয়ালা নিজের গ্রামের কিছু লোকজন এনে খলিফাপট্টিতে কাপড় তৈরির কাজ শুরু করেন।
প্রায় ৮০ বছরের পুরোনো এই এলাকায় ৩০০-এর বেশি কারখানা আছে। এগুলোর একেকটির আয়তন ১০০ থেকে ২০০ বর্গফুট। মাথার ওপর সারাক্ষণ জ্বলছে সাদা রঙের এনার্জি সেভার লাইট। বাতাস দিচ্ছে দেয়ালে লাগানো ফ্যান। বিদ্যুৎ চলে গেলেই ভাপসা গরমে অসহনীয় হয়ে ওঠে ঘরের ভেতর। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা সেলাই মেশিন চলার খটখট শব্দ কানে আসে খলিফাপট্টির ঘরগুলো থেকে। উঁকি মারলেই দেখা যায় ঘরময় ছড়ানো-ছিটানো কাপড়-সেগুলোর কিছু সেলাই করা, কিছুতে সেলাইয়ের কাজ চলছে। চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লা মোড়ের কাছাকাছি খলিফাপট্টিতে ঈদের এ মৌসুমে ব্যস্ততা এখন চূড়ান্ত।
এখানকার কোনো কোনো কারখানায় ৩ থেকে ৪টি, আবার কোনোটিতে ৬টি সেলাই মেশিন বসানো। সেগুলোতে পুরুষের তুলনায় নারী ও শিশুদের পোশাক বেশি তৈরি হয়। পুরুষের পাশাপাশি এখানে নারীরাও কাজ করছেন। কর্মরত এই মানুষের বেশির ভাগই বংশপরম্পরায় পোশাক সেলাইয়ের এ ব্যবসায় যুক্ত। এসব কারখানায় ৪ হাজারের বেশি কর্মচারী কাজ করেন। পাইকারি ও খুচরা দুই ধরনের ব্যবসাই হয় এখানে।
প্রায় ৪৫ বছর ধরে খলিফাপট্টিতে কাপড়ের ব্যবসা করছেন নোয়াখালীর বাসিন্দা মো. শরীফউল্লাহ। ১০ বছর বয়সে তিনি এখানে আসেন। ভাইয়ের দোকানে প্রথমে তিনি কাপড় সেলাইয়ের কাজ শেখেন। পরে নিজেই একটি দোকান দেন। মাঝখানে খারাপ সময় গেলেও ঈদ ঘিরে এখন মোটামুটি ব্যবসা হচ্ছে বলে জানালেন শরীফ। দেড় শ টাকা থেকে শুরু করে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দামের পোশাক বিক্রি হয় এখানে। তবে ক্রেতারা মূলত এখানে আসেন কম দামের পোশাক কিনতে