প্রকাশ: শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১:৪৫ পিএম (ভিজিট : ২১)

X
এআই জেনারেটেড ছবি
বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবেরদের সম্পদের ওপর। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বের শীর্ষ ১০ জন ধনীর মধ্যে সাতজনই তাদের সম্পদের একটি বড় অংশ হারিয়েছেন। বৈশ্বিক বাজার বছরের শুরুতে ইতিবাচক ধারায় বজায় থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হওয়ার পর বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। ফলে এ সাতজন ধনকুবের সম্মিলিতভাবে ১৭০ দশমিক ৩ বিলিয়ন বা ১৭ হাজার ৩০ কোটি ডলার সমপরিমাণ সম্পদ হারিয়েছেন। খবর আনাদোলু এজেন্সি।
বিশ্ব অর্থনীতিতে এ অস্থিরতার মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধাবস্থাকে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া পাল্টাপাল্টি হামলা এবং সংঘাত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে শেয়ারবাজারে ধস নামে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকট বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়েছে। ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং চীন ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপড়েন বৈশ্বিক বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এমনকি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
চলমান এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ফরাসি ফ্যাশন জায়ান্ট এলভিএমএইচের প্রধান নির্বাহী (সিইও) বার্নার্ড আর্নল্ট। শীর্ষ ধনীদের তালিকায় থাকা এ ব্যবসায়ীর সম্পদ সবচেয়ে বেশি কমেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে প্রায় ৫ হাজার ৫৪০ কোটি ডলার উধাও হয়ে গেছে। বর্তমানে তার মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে। বিলাসদ্রব্য উৎপাদনকারী এ খাতের ব্যবসায়ীরা সাধারণত বিশ্ববাণিজ্যের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল থাকেন। তাই যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এ খাতে বড় ধরনের লোকসান লক্ষ করা যাচ্ছে।
প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরাও এ ধস থেকে রেহাই পাননি। মার্কিন টেক জায়ান্ট ওরাকলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসনের সম্পদ প্রায় ৫ হাজার ২৪০ কোটি ডলার কমে ১৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। একইভাবে মেটার সিইও মার্ক জাকারবার্গের সম্পদ ৩ হাজার ৫০ কোটি ডলার কমে বর্তমানে ২ হাজার ৪০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের সম্পদ কমেছে ২ হাজার ৩৩০ কোটি ডলার। এছাড়া সার্চ ইঞ্জিন গুগলের দুই সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিনের সম্পদও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ল্যারি পেজ হারিয়েছেন ২ হাজার ১৯০ কোটি ডলার এবং সের্গেই ব্রিন হারিয়েছেন ২ হাজার ৪০ কোটি ডলার। চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংয়ের সম্পদ কমেছে ১ হাজার ১০ কোটি ডলার।
বিশ্বের অধিকাংশ শীর্ষ ধনী যখন লোকসানের মুখে পড়েছেন, তখন স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সম্পদ বাড়িয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলোন মাস্ক। শেয়ারবাজারের তীব্র ওঠানামা সত্ত্বেও তিনি তার সম্পদের পরিমাণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। বছরের শুরু থেকে মাস্কের সম্পদ বেড়েছে ২ হাজার ৪২০ কোটি ডলার। বর্তমানে তার মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে। ফলে তালিকার অন্যদের চেয়ে তিনি এখন অনেকটা ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। বিনিয়োগকারীদের ধারণা, মহাকাশ গবেষণা ও বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) বাজারে মাস্কের একচ্ছত্র আধিপত্য তাকে এ মন্দার মধ্যেও টিকিয়ে রেখেছে।
বিলাসবহুল পণ্য বা প্রযুক্তি খাতের তুলনায় খুচরা বিক্রয় বা রিটেইল খাতে ধসের প্রভাব তুলনামূলক কম দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় গ্রোসারি চেইন ওয়ালমার্টের উত্তরাধিকারীরা এ অস্থির সময়ের মধ্যেও নিজেদের সম্পদ বাড়াতে পেরেছেন। জিম কারের সম্পদ ৯৮০ কোটি ডলার এবং স্যামুয়েল রবসন ওয়ালটনের সম্পদ ৯৭০ কোটি ডলার বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংকটের সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বেশি থাকে, যার সুফল পেয়েছেন ওয়ালমার্টের মালিকরা।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিচ্ছে, তাতে বিশ্ব অর্থনীতিতে আরো দীর্ঘমেয়াদি সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের দ্রুত উন্নতি না হলে শেয়ারবাজারের এ অস্থিরতা কমবে না। বিনিয়োগকারীরা এখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বাজার পর্যবেক্ষণ করছেন। আন্তর্জাতিক এ সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের সম্পদের ওপর যে গভীর প্রভাব ফেলেছে, তা বিশ্ব অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থাকেই ফুটিয়ে তুলছে। আগামী দিনগুলোয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারণ হবে এ ধনকুবেরদের ভাগ্যের ভবিষ্যৎ। বিশ্বজুড়ে মানুষ এখন নজর রাখছে কোন দিকে মোড় নেয় এ ভূরাজনৈতিক সংকট।