
X
বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) বহরে নতুন দুটি আধুনিক বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ সংযোজনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এমভি বাংলার প্রগতি এবং এমভি বাংলার নবযাত্রা নামের জাহাজ দুটি যথাক্রমে ২৩ অক্টোবর ২০২৫ ও চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি চীনের জিংজিয়াং নানইয়াং শিপবিল্ডিং কোম্পানি লিমিটেড থেকে ডেলিভারি গ্রহণ করা হয়।
ডেলিভারি গ্রহণের সময় বিএসসি ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি, বায়ার সুপারভাইজার, জাহাজের মাস্টার, চিফ ইঞ্জিনিয়ার, নাবিকসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার অংশ নেন।
বর্তমানে জাহাজ দুটি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে বাংলার প্রগতি পোল্যান্ডের গদানস্ক বন্দরে এবং বাংলার নবযাত্রা সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছে। প্রতিটি জাহাজ দৈনিক গড়ে প্রায় ২০ হাজার মার্কিন ডলারে চার্টারে পরিচালিত হচ্ছে। সংযোজনের পর থেকে এখন পর্যন্ত জাহাজ দুটি থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আয় হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
জাহাজ দুটি সংগ্রহের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সুপারিশ অনুমোদনের পর ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিএসসি ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি’র মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ০৪ জুন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করা হয়।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকল্পটি জুন ২০২৫ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ০৩ জুন ২০২৫ অনুমোদন পায়। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১,১৬,২৯৬.২৪ লাখ টাকা। প্রতিটি জাহাজের মূল্য ৩৮.৩৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং দুটি জাহাজের মোট মূল্য ৭৬.৬৯৮ মিলিয়ন ডলার, যা দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ৮০.৪০ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৪.৬০ শতাংশ কম।
জাহাজ দুটি সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের ভিত্তিতে কারিগরি যাচাই-বাছাই করা হয় এবং মূল্যায়ন কমিটি সরেজমিনে নির্মাণ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে। এ সময় ক্লাসিফিকেশন সোসাইটির বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় জাহাজের স্পেসিফিকেশন ও কারিগরি মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হয়।
নতুন জাহাজ দুটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে নির্মিত। এতে গ্রিন শিপ কনসেপ্ট, আইএমও টিয়ার-৩ সার্টিফায়েড ইঞ্জিন, সিলেকটিভ ক্যাটালিটিক রিডাকশন (SCR) ও এক্সহস্ট গ্যাস বয়লার (EGB), কনট্রা রোটেটিং প্রপেলার (CRP), বাল্বাস বাউবিহীন আধুনিক হাল ডিজাইন এবং এরোডাইনামিক ব্রিজ ব্যবহৃত হয়েছে। এসব প্রযুক্তি জ্বালানি সাশ্রয়, গতি বৃদ্ধি এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
জাহাজে ব্যবহৃত প্রধান ইঞ্জিন জার্মান লাইসেন্সধারী MAN-B&W (চীনে সংযোজিত) এবং পাম্প স্পেন থেকে ও কম্প্রেসার নরওয়ে থেকে সরবরাহ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করে।
বিএসসি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আরও জাহাজ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘জি-টু-জি’ ভিত্তিতে দুটি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাংকার ও দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ সংগ্রহ প্রকল্পে গত ১১ মার্চ ২০২৬ ঋণচুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ৪০ থেকে ৫৫ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার দুটি প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার সংগ্রহের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা চলতি বছরের ২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তা একনেকে উপস্থাপনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
বর্তমানে বিএসসির সাতটি জাহাজ বাংলাদেশি পতাকা বহন করে আন্তর্জাতিক রুটে চলাচল করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন বন্দরে সফলভাবে যাতায়াত করছে। এসব জাহাজ আন্তর্জাতিক সংস্থার নিরাপত্তা মানদণ্ড যেমন ইউএস কোস্ট গার্ড (USCG), অস্ট্রেলিয়ান মেরিটাইম সেফটি অথরিটি (AMSA), SIRE এবং RightShip-এর বিভিন্ন পরিদর্শনে উত্তীর্ণ হয়েছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান Maersk Tankers A/S এবং Cargill Ocean Transportation (Singapore) Pte Ltd-এর কাছে বিএসসির ট্যাংকার জাহাজ বাংলার অগ্রদূত ও বাংলার অগ্রযাত্রা বাণিজ্যিকভাবে নিয়োজিত রয়েছে।
লাভজনক চার্টারিং, বহুমুখী পণ্য পরিবহন (সার, ক্রুড অয়েল, প্রোডাক্ট অয়েল ও কেমিক্যাল) এবং স্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিএসসি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা আয় এবং ৩০৬ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে, যা সংস্থাটির ৫৪ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।