
X
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন প্রকাশ
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণা বলছে, দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ ওষুধ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষায় যাচ্ছে এবং উচ্চ খরচের কারণে ৬৫% স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা অপূর্ণ থাকছে। এছাড়াও, ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় সবচেয়ে বেশি এবং ওষুধের পিছনে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়।
অপূর্ণ থাকা চিকিৎসা চাহিদা, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের প্রকৃত চিত্র মূল্যায়ন এবং সুবিধা ও অর্থায়নের প্রভাব বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্য চিহ্নিত করার লক্ষ্যে বিআইডিএসের জনসংখ্যা অধ্যয়ন বিভাগ এই গবেষণা পরিচালনা করেছে। গবেষণায় সর্বশেষ গৃহস্থালি আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ সালের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ১৪ হাজার ৪০০টি পরিবার এবং ৬২ হাজার ৩৮৭ জন ব্যক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ‘দেশে অপূর্ণ থাকা স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয়ের গতিশীলতা পুনর্বিবেচনা’ শীর্ষক ওই গবেষণার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
গবেষণার সারসংক্ষেপে বলা হয়, দেশে মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ মানুষ মাসে অন্তত একবার চিকিৎসার প্রয়োজন অনুভব করেন। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ মানুষ তাদের প্রয়োজনের ৬৫ শতাংশের চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন না। গ্রামীণ এলাকায় এই অপূর্ণ স্বাস্থ্য চাহিদা শহরের তুলনায় বেশি। গ্রামে এই হার ৬৮ শতাংশএবং শহরে ৫৯ শতাংশ।
২০২৪ সালের তথ্য যুক্ত করে বিআইডিএস জানিয়েছে, দেশে চিকিৎসা খাতে মোট ব্যয়ে ৭৯ শতাংশ ব্যক্তির পকেট থেকে যায়। এখনও অর্থের অভাবে অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারছেন না।
গবেষণার তথ্য বলছে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন না এমন মানুষের হার জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি নড়াইলে। এ জেলায় ৮১ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চাহিদা পূরণ করতে পারেন না। এর পরের অবস্থানে রয়েছে হবিগঞ্জ জেলা। এ জেলায় ৮০শতাংশ মানুষ তাদের চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন মেটাতে পারেন না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চাহিদা পূরণ করতে পারেন এমন মানুষের হার সবচেয়ে কম ফেনী জেলায়। যেখানে এই হার ১৮ শতাংশ।
গবেষণায় ব্যয়ের দিক থেকে দেখা গেছে, একটি পরিবার গড়ে প্রতি মাসে ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা চিকিৎসায় ব্যয় করেযা মোট পারিবারিক ব্যয়ের ১১ শতাংশ। এই ব্যয়ের বড় অংশই যায় ওষুধ এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায়।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবা নেয়া তুলনামূলকভাবে সমভাবে বণ্টন করা হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা গ্রহণ বেশি ধনী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যদিও ধনী মানুষের মোট ব্যয় বেশি, তবে দরিদ্র মানুষের ওপর আর্থিক চাপ অনেক বেশি। দরিদ্র পরিবার তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ চিকিৎসায় ব্যয় করেযেখানে ধনীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৫ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রতিক্রিয়াশীল প্রকৃতির।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে হাসপাতালে ভর্তিকালীন একজন রোগীর ব্যয়ের একটি চিত্র । তাতে দেখা গেছে, মোট ব্যয়ের সর্বোচ্চ২৬ শতাংশখরচ হচ্ছে ওষুধের জন্য। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় হয় অস্ত্রোপচারে, যার পরিমাণ২৩ শতাংশ। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের রোগ নির্ণয় বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ব্যয় করতে হয়১৭ শতাংশঅর্থ। হাসপাতালে অবস্থানের জন্য শয্যা ভাড়া বাবদ খরচ হয়১৬ শতাংশ। অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে৭ শতাংশএবং যাতায়াত বা পরিবহনের পেছনে৬ শতাংশঅর্থ ব্যয় হয়। সবশেষে, চিকিৎসকের পরামর্শ ফি হিসেবে ব্যয় হয় মোট খরচের মাত্র ৫ শতাংশ।
দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকার সুরক্ষা এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসার খরচ কমিয়ে আনতে স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের সংস্কারের দাবি জানানো হয়। আরও বলা হয়, বর্তমানে অসুস্থতা আমাদের দেশের মানুষের দরিদ্র হয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর কারণ তাদের চিকিৎসার সিংহভাগ খরচ নিজেদের পকেট থেকেই বহন করতে হয়।বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকে সাধারণ মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দেশের বাস্তবতায় সব সেবা কেবল সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া সম্ভব না হলেও, কোন কোন ক্ষেত্রে কী ধরনের সেবা দেওয়া হবে তা সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই খাতে পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা উচিত, যাতে সাধারণ মানুষ বড় হাসপাতালের ওপর নির্ভর না করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকেই মানসম্মত চিকিৎসা পায়। যদি তৃণমূল পর্যায়ের এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়তবে মানুষের নিজের পকেট থেকে করা খরচের বোঝা কমবে। একইসঙ্গে আর্থিক বিপর্যয় থেকে তারা রক্ষা পাবে। বিত্তবানরা দেশে বা বিদেশে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য রাখলেও সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।