
X
সংগৃহীত ছবি
মাত্র একদিন পরই পবিত্র ঈদুল আজহা। কোরবানির ঈদকে ঘিরে শেষ মুহূর্তে জমে উঠেছে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ৫/৬ নং বাজারের পশুর হাট। হাজারো গরুর হাঁকডাকে মুখরিত পুরো হাট এলাকা। ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের দেশীয় গরুর পাশাপাশি হাটে উঠেছে দেশি-বিদেশি জাতের ছাগল ও ভেড়া। তবে এবার বড় গরুর তুলনায় ছোট ও মাঝারি গরুর প্রতিই ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা খামারি ও ব্যবসায়ীরা সকাল থেকেই গরু নিয়ে হাটে অবস্থান নিয়েছেন। কোথাও দরদাম, কোথাও ক্রেতা-বিক্রেতার হিসাব-নিকাশ—সব মিলিয়ে ঈদ ঘিরে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে পুরো বাজার। কিন্তু সেই উৎসবের ভিড়েও চোখে পড়ছে এক ধরনের চাপা উদ্বেগ। চড়া দামের কারণে অনেক ক্রেতাই পছন্দের পশু কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন।
হাটে আসা ক্রেতাদের ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় এ বছর ছোট ও মাঝারি গরুর দাম অনেকটাই বেশি। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এসব গরুর চাহিদা বেশি থাকায় দামও বেড়েছে। অন্যদিকে বড় গরুর চাহিদা তুলনামূলক কম।
ক্রেতা সামছুল আলম বলেন, “একটি গরুর দাম প্রথমে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল। পরে দরদাম করে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকায় কিনেছি। কিন্তু আমার মতে, গরুটির দাম ২ লাখ ১০ হাজার টাকার মধ্যেই হওয়া উচিত ছিল।”
তবে শুধু ক্রেতারাই নন, দুশ্চিন্তায় রয়েছেন খামারিরাও। তাদের অভিযোগ, গো-খাদ্য, ওষুধ ও লালন-পালনের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে লোকসানের মুখে পড়তে হবে।
খামারি রেজাউল মিয়া জানান, “আমার খামারে সাত থেকে দশ মণ ওজনের ১০টি গরু ছিল। এর মধ্যে মাত্র দুটি বিক্রি করতে পেরেছি। প্রতিটি গরুর পেছনে প্রায় ৫৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বাজারে সেই অনুপাতে দাম পাচ্ছি না।”
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলায় কোরবানির জন্য প্রায় সাড়ে আট হাজার গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় সরবরাহ কিছুটা কম। চাহিদার তুলনায় পশুর সংখ্যা কম হওয়ায় বাজারে সংকটের আশঙ্কাও করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবুল কাসেম বলেন, “উপজেলায় কোরবানির পশুর পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। প্রতিটি হাটে দুটি মেডিক্যাল টিম দায়িত্ব পালন করছে। পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অসুস্থ পশুর চিকিৎসা ও সার্বিক মনিটরিং করা হচ্ছে। কৃত্রিমভাবে মোটাতাজাকরণ করা পশু যাতে বাজারে প্রবেশ করতে না পারে, সেদিকেও কঠোর নজরদারি রয়েছে।”
হাট ইজারাদার সাইফুল ইসলাম টিপু জানান, ঈদ সামনে রেখে হাটে ব্যাপক ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম ঘটেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক টিমও কাজ করছে। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই অনেক ব্যবসায়ী গরু নিয়ে বড় বাজার ও গ্যানিংগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে যাওয়ায় ইজারাদাররা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে ধারণা প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
এদিকে স্থানীয় পাইকারদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা উপজেলার বিভিন্ন ছোট হাট থেকে গরু কিনে বড় বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসছেন। সব মিলিয়ে কোরবানির ঈদকে ঘিরে বানিয়াচংয়ের ঐতিহ্যবাহী ৫/৬ নং বাজারের পশুর হাট এখন যেন গ্রামীণ অর্থনীতির এক বিশাল প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে—যেখানে একদিকে ধর্মীয় আবেগ, অন্যদিকে জীবিকার সংগ্রাম মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য বাস্তবতার ছবি।