আমিরাতে ভিসা নবায়ন জটিলতায় হাজারো বাংলাদেশি

নওশের আলম সুমন, ইউএই

প্রবাস

সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) কর্মরত হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী বর্তমানে এক জটিল ও বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি।

2026-05-31T10:26:46+00:00
2026-05-31T10:26:46+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
আমিরাতে ভিসা নবায়ন জটিলতায় হাজারো বাংলাদেশি
নওশের আলম সুমন, ইউএই
প্রকাশ: রোববার, ৩১ মে, ২০২৬, ১০:২৬ এএম   (ভিজিট : ৩৯৮)
ফাইল ছবি
X

ফাইল ছবি

সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) কর্মরত হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী বর্তমানে এক জটিল ও বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। ভিসা নবায়ন প্রক্রিয়ায় জটিলতা, সীমিত ও অতীতে কার্যকর থাকা ভিসা ট্রান্সফার ব্যবস্থার বাস্তব সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক কড়াকড়ি এবং দীর্ঘদিনের ভিসা-সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে দেশটিতে বসবাসরত বহু বাংলাদেশি কর্মসংস্থান ও বৈধ অবস্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছেন।

প্রবাসীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর বৈধভাবে কাজ করার পরও অনেকের ভিসা নবায়ন প্রক্রিয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে কর্মচুক্তি শেষ হওয়ার পর নতুন প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়ায় অনেকেই কর্মস্থল পরিবর্তন করতে পারছেন না। ফলে একদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ হারাচ্ছেন, অন্যদিকে বৈধ অবস্থান নিয়েও তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।

দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ, আজমান, রাস আল খাইমাহ, ফুজাইরাহ এবং উম্ম আল কুয়াইনসহ বিভিন্ন আমিরাতে কর্মরত বাংলাদেশিদের অনেকেই জানান, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে থাকলেও নবায়নের বিষয়ে তারা স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়ছেন অথবা আয়ের উৎস হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশিদের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতে শ্রমিক ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে। এর ফলে দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত পরিসরে পরিচালিত হয়ে আসছে।

একই সঙ্গে ভিসা স্থানান্তর বা ট্রান্সফার ব্যবস্থাও সব সময় পূর্ণাঙ্গভাবে উন্মুক্ত ছিল না। নির্দিষ্ট কিছু পেশা, প্রতিষ্ঠান বা বিশেষ শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সীমিত আকারে এই সুবিধা কার্যকর ছিল। তবে বাস্তবতা হলো বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে এই সুযোগ আগের তুলনায় আরও সীমিত হয়ে পড়েছে বলে প্রবাসীদের অভিযোগ।

প্রবাসীদের অভিযোগ, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নবায়নের জন্য আবেদন বা অনুমতি চাইলে অনেক ক্ষেত্রে তা তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব সিদ্ধান্তের সুনির্দিষ্ট কারণ সংশ্লিষ্টদের কাছে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে না বলেও তারা দাবি করেছেন। ফলে প্রবাসীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি জাল শিক্ষাগত সনদ, ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ এবং অন্যান্য ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে ভিসা ও কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন। এসব অনিয়ম দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর ভিসা যাচাই ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় আরও কঠোরতা আরোপ করা হয়।

এছাড়া অল্পসংখ্যক বাংলাদেশির আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডও দেশটির অভিবাসন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা তৈরি করেছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।

পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় আসে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে। সে সময় দুবাইসহ সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন অঞ্চলে কিছু বাংলাদেশি প্রবাসী বাংলাদেশের চলমান আন্দোলনের সমর্থনে বিক্ষোভে অংশ নেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইন অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া বিক্ষোভ, জনসমাবেশ কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফলে ঘটনাটি দেশটির কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরে আসে। পরবর্তীতে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার ও দণ্ডিত করা হয়। যদিও পরে তাদের অনেকেই সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি পান, সংশ্লিষ্টদের মতে, ওই ঘটনার পর থেকে বাংলাদেশিদের ভিসা ও অভিবাসন-সংক্রান্ত বিষয়ে নজরদারি ও যাচাই-বাছাই আরও কঠোর হয়েছে।

প্রবাসী নেতৃবৃন্দ ও কমিউনিটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, দীর্ঘদিনের ভিসা বিধিনিষেধ, বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহ সব মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আগের তুলনায় আরও কঠোর ও সতর্কতামূলক হয়ে উঠেছে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছেন সাধারণ শ্রমজীবী প্রবাসীরা। যারা বছরের পর বছর আইন মেনে কাজ করেছেন, স্থানীয় নিয়মকানুন অনুসরণ করেছেন এবং নিয়মিতভাবে দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে আসছেন, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। ভিসা নবায়ন অনিশ্চয়তার কারণে প্রবাসীরা অবৈধ অবস্থায় পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিএমইটি ও মিশন সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দুবাই, আবুধাবিসহ বিভিন্ন আমিরাতে বাংলাদেশিদের সংখ্যা বর্তমানে আনুমানিক ১০ লাখ, যদিও কমিউনিটি ও অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ পর্যন্ত হতে পারে।

অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রবাসী জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩০.৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ হাজার ৩৩ কোটি ডলার)।
এর মধ্যে শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেই এসেছে প্রায় ৫.৫ থেকে ৬.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৬০,০০০ থেকে ৭০,০০০ কোটি টাকা), যা দেশের অন্যতম বৃহৎ একক শ্রমবাজার থেকে প্রাপ্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ হিসেবে বিবেচিত।

প্রবাসীদের অনেকেই জানান, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে থাকলেও নবায়নের বিষয়ে তারা স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন না। অনেকের কর্মচুক্তি শেষ হলেও নতুন প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।

প্রবাসীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে থাকা পরিবারগুলোর প্রধান বা একমাত্র আয়ের উৎস অনেক ক্ষেত্রেই তাদের পাঠানো অর্থ। ফলে ভিসা জটিলতা ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা সরাসরি পরিবারগুলোর ওপর প্রভাব ফেলছে।
সন্তানের শিক্ষাব্যয়, পারিবারিক খরচ, ব্যাংকঋণ এবং বিভিন্ন আর্থিক দায়বদ্ধতা মেটাতে গিয়ে পরিবারগুলো এখন চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। অনেক প্রবাসী বলছেন, বছরের পর বছর পরিশ্রম করে গড়ে তোলা জীবিকা এখন অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় অংশ যোগান দেন। ফলে ভিসা জটিলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে রেমিট্যান্স প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে উচ্চপর্যায়ে আরও কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনা প্রয়োজন। পাশাপাশি ভিসা নবায়ন, কর্মসংস্থান এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলো নিয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।

প্রবাসীদের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে বিদ্যমান জটিলতার সমাধান হবে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত বাংলাদেশিরা আবারও স্থিতিশীল ও নিরাপদ কর্মপরিবেশে কাজ করার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদানও অব্যাহত থাকবে।




  বিষয়:   আমিরাত  লাদেশি  ভিসা নবায়ন 



Loading...
Loading...


প্রবাস এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy