
X
ছবি: প্রতিনিধি
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একদিকে যেমন তীব্র চিকিৎসক সংকট, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে রোগীদের চিকিৎসাসেবা। দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত ঘোষিত পুরোনো দ্বিতল ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল, খসে পড়া পলেস্তারা ও বেরিয়ে থাকা রডের মধ্যেই প্রতিদিন চিকিৎসা নিচ্ছেন শত শত রোগী। এতে রোগী, স্বজন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে স্থায়ী আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, পুরুষ ও নারী ওয়ার্ড এখনো পুরোনো ভবনেই পরিচালিত হচ্ছে। ভবনের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা গেছে। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে কোথাও কোথাও রড বেরিয়ে আছে। বৃষ্টি হলে ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে রোগীদের বিছানা পর্যন্ত ভিজে যায়। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এক কর্মচারীকে হেলমেট পরে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।
হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক ও নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঝুঁকির বিষয়টি সম্পর্কে সবাই অবগত থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
রোগী ও স্বজনদের মধ্যেও উদ্বেগ বিরাজ করছে। হাসপাতালে ভর্তি এক রোগীর স্বজন রহিম মিয়া বলেন, “রাতে ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ার শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। সব সময় ভয় লাগে।” আরেক স্বজন আলেয়া বেগমের ভাষায়, “রোগের চিকিৎসা নিতে এসে দুর্ঘটনার শঙ্কায় থাকতে হচ্ছে।”
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, ৩১ শয্যার হাসপাতালটি কয়েক বছর আগে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল বৃদ্ধি পায়নি। বর্তমানে পুরোনো ভবনের নারী ও পুরুষ ওয়ার্ডে ৩১টি এবং নতুন ভবনের শিশু ওয়ার্ডে ১৯টি শয্যা চালু রয়েছে। নতুন ভবনে চিকিৎসকদের কক্ষ, টিকাদান কেন্দ্র ও অপারেশন থিয়েটার থাকলেও সব বিভাগ সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি।
জনবল সংকটও হাসপাতালের সেবাকে ব্যাহত করছে। অনুমোদিত ৪৫ জন চিকিৎসকের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৯ জন। ৩০ জন নার্সের মধ্যে কর্মরত ২৬ জন এবং ১৫ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর বিপরীতে রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। ফলে সীমিত জনবল নিয়ে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকেন। মাধবপুর উপজেলার পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও বিজয়নগর উপজেলার হাজারো মানুষও এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের প্রায় ২৬ কিলোমিটার অংশ এ উপজেলার মধ্য দিয়ে যাওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদেরও প্রধান ভরসা এই হাসপাতাল।
এদিকে এলাকায় শিল্পকারখানার সংখ্যা বাড়লেও এখনো স্থাপন করা হয়নি কোনো ট্রমা সেন্টার। স্থানীয়দের মতে, ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় হাসপাতালের অবকাঠামো ও জনবল—দুটিই অপ্রতুল।
মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ইমরুল হাসান বলেন, “পুরোনো ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে। বিষয়টি একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত সংস্কার বা বিকল্প ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।”
তিনি জানান, বাজেট সংকটের কারণে এখনো সংস্কারকাজ শুরু হয়নি। তবে আগামী জুনের পর মেরামত কার্যক্রম শুরু হতে পারে। বর্তমানে এক্স-রে বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমও পুরোনো ভবনেই পরিচালিত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দ্রুত নিরাপদ স্থাপনায় স্থানান্তর, চিকিৎসক ও কর্মচারী সংকট নিরসন এবং একটি আধুনিক ট্রমা সেন্টার স্থাপনে জরুরি উদ্যোগ নেওয়া হোক। অন্যথায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।