
X
ছবি: প্রতিনিধি
নীলফামারীর সৈয়দপুরে গড়ে ওঠা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানাগুলোতে এখন এক সময়ের রেলওয়ের আমদানিনির্ভর যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে। আগে বিদেশ থেকে আমদানিনির্ভর রেলওয়ের প্রায় ১৬০ ধরনের যন্ত্রপাতির বড় একটি অংশ এখন তৈরি হচ্ছে স্থানীয় কারিগরদের হাতেই। অবসরপ্রাপ্ত রেলশ্রমিকদের দক্ষতা, দেশীয় প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টায় এ খাত ধীরে ধীরে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই এই শিল্প এখন দেশের রেলওয়ে যন্ত্রপাতি উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।
স্থানীয় উদ্যোক্তারা জানান, একসময় রেলওয়ের কোচের ফ্যান, জানালা, রেলক্রসিংয়ের সিগন্যাল বাতিসহ প্রায় ১৬০ ধরনের পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো। এখন এসব যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে সৈয়দপুরে গড়ে ওঠা ওয়ার্কশপগুলোতে। পাশাপাশি স্থানীয় বেকারি, সাবান কারখানা, ইটভাটাসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও এখানকার তৈরি মেশিন ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশও এখন আর ভারত বা চীন থেকে আমদানি না করে স্থানীয় কারখানাতেই তৈরি হচ্ছে।
এসব কারখানায় কাজ করছেন রেলের অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকরা। তাদের হাতেই তৈরি হচ্ছে রেলকোচের ১৬০ প্রকারের যন্ত্রপাতি। এর মধ্যে খড়কাটা মেশিনসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় মেশিন ও যন্ত্রাংশও রয়েছে।
উদ্যোক্তাদের দাবি, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় কোচ মেরামতের জন্য এতদিন জার্মানি থেকে আমদানি করা হতো স্ক্রু লিফটিং জ্যাক, যার দাম প্রায় দেড় কোটি টাকা। অথচ সৈয়দপুরে এটি তৈরি হচ্ছে মাত্র ৫০ লাখ টাকায়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে এখান থেকে পণ্যটি কেনা শুরু করেছে।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার পাশাপাশি চিলাহাটি, ঈশ্বরদী ও ঢাকার জন্যও এটি কেনা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সিলেটের জন্য একটি স্ক্রু লিফটিং জ্যাকের অর্ডার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ইমার্জেন্সি ব্রেক ভালভ এখানে তৈরি হচ্ছে ১৫ হাজার টাকায়, যা আমদানি করতে খরচ হতো ৪৫ হাজার টাকা। রেলওয়ে ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র স্যান্ড বক্সও তৈরি হচ্ছে এখানে। রেললাইন পিচ্ছিল হলে বা উঁচু স্থানে ওঠার সময় ব্রেক কাজ না করলে চাকায় শুকনা বালু স্প্রে করতে এই স্যান্ড বক্স ব্যবহার করা হয়। এটি মাত্র ২৫ হাজার টাকায় তৈরি করছে সৈয়দপুরের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানাগুলো।
সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরীসহ বিভিন্ন ওয়ার্কশপে প্রায় ৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন, যাদের বেশিরভাগই রেলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। তারা বিদেশি পণ্যের হুবহু বিকল্প পণ্য তৈরি করছেন, যা মানের দিক থেকেও ভালো বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানির সম্ভাবনা থাকলেও এই শিল্প সরকারি পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কোনো সহযোগিতা পাচ্ছে না। উদ্যোক্তাদের মতে, ব্যাংকঋণ ও সরকারি প্রণোদনা পেলে এসব প্রতিষ্ঠান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় সব ধরনের যন্ত্রাংশ তৈরি করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে।
বাংলাদেশ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আগামী দিনে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই খাত দেশের অর্থনীতিকে আরও এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে। এ অঞ্চলের কারিগর ও উদ্যোক্তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সরকারি সহযোগিতা দেওয়া হলে এই খাত জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারবে।
পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর দাবি জানান তিনি।
নীলফামারী জেলা সভাপতি এরশাদ হোসেন পাটোয়ারী জানান, সৈয়দপুরের প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্প খাতে বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম। শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে বিষয়টি এসেছে। তিনি এ শিল্পের বিকাশে সহজ শর্তে ঋণ ও আর্থিক সহায়তার দাবি জানান।