কাপাসিয়ায় কাঁঠালের প্রাচুর্য, উৎপাদন বেশি হলেও দামে হতাশ চাষি

কাপাসিয়া (গাজীপুর) প্রতিনিধি

সারাবাংলা

জাতীয় ফল কাঁঠালের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা। বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই উপজেলার গ্রাম-গঞ্জজুড়ে এখন কাঁঠালের সমারোহ। বাড়ির

2026-06-24T17:35:08+00:00
2026-06-24T17:41:37+00:00
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬
   
কাপাসিয়ায় কাঁঠালের প্রাচুর্য, উৎপাদন বেশি হলেও দামে হতাশ চাষি
কাপাসিয়া (গাজীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ৫:৩৫ পিএম  আপডেট: ২৪.০৬.২০২৬ ৫:৪১ পিএম  (ভিজিট : ৮৬)
কাপাসিয়ায় কাঁঠালের প্রাচুর্য, উৎপাদন বেশি হলেও দামে হতাশ চাষি
X

কাপাসিয়ায় কাঁঠালের প্রাচুর্য, উৎপাদন বেশি হলেও দামে হতাশ চাষি

জাতীয় ফল কাঁঠালের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা। বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই উপজেলার গ্রাম-গঞ্জজুড়ে এখন কাঁঠালের সমারোহ। বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারের গাছ, পুকুরপাড়, বাগান ও কৃষিজমির চারপাশে ছোট-বড় অসংখ্য কাঁঠাল ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। কোথাও একটি গাছে ২০-৩০টি, আবার কোথাও শতাধিক কাঁঠাল ধরেছে। প্রকৃতির এই অপরূপ দৃশ্য যেমন চোখ জুড়াচ্ছে, তেমনি উৎপাদনের প্রাচুর্যে বাজারদর কমে যাওয়ায় হতাশ কৃষকরা।

উপজেলার টোক, উজলী দিঘীরপাড়, চৌকারচালা, নরসিংহপুর, জলপইতলা, বেগুনি, ভাকোয়াদী, কাপাসিয়া সদর ও চাঁদপুর বাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রতিদিন ভোর থেকেই জমে উঠছে কাঁঠালের বেচাকেনা। কৃষকরা ভ্যান, অটোরিকশা ও অন্যান্য ছোট যানবাহনে করে কাঁঠাল নিয়ে আসছেন বাজারে। অন্যদিকে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা ও চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকাররা এসব কাঁঠাল কিনে ট্রাকযোগে দেশের নানা প্রান্তে পাঠাচ্ছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাজারসংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, মৌসুমের শীর্ষ সময়ে কাপাসিয়া থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬০ থেকে ৮০টি ট্রাক কাঁঠাল দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। ঢাকার বড় ফলের আড়তসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাপাসিয়ার কাঁঠালের বিশেষ চাহিদা রয়েছে।

তবে উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। আকার ও মানভেদে কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কাঁঠাল মাত্র ২০ থেকে ৭০ টাকায় কিনে নিচ্ছেন পাইকাররা। অথচ ভোক্তা পর্যায়ে সেই কাঁঠাল দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সময়মতো ক্রেতা না পাওয়ায় অনেক কৃষক গাছের কাঁঠাল তুলতে পারছেন না। ফলে অনেক কাঁঠাল গাছেই পেকে নষ্ট হচ্ছে। কোথাও ঝড়ে পড়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও পাখির খাদ্যে পরিণত হচ্ছে। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকরা বাধ্য হয়ে কম দামে কাঁঠাল বিক্রি করছেন।

কেন্দুয়াব গ্রামের পাইকার আব্দুল কাদির বলেন, “কাপাসিয়ার কাঁঠালের স্বাদ ও গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন। কিন্তু সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যায়। তখন কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।”

বড়চালা গ্রামের পাইকার মফিজ উদ্দিন বলেন, “গ্রাম থেকে কাঁঠাল সংগ্রহ করে বিভিন্ন বাজারে আনি। এরপর ট্রাকে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। পরিবহন, শ্রমিক ও লোড-আনলোড খরচ মিলিয়ে প্রতিটি কাঁঠালে অতিরিক্ত ব্যয় হয়। তারপরও ঝুঁকি নিয়েই ব্যবসা করতে হচ্ছে।”

ছাটারব গ্রামের ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক বলেন, “কাঁঠালের মৌসুমকে ঘিরে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়। গাছ থেকে কাঁঠাল নামানো, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ সব মিলিয়ে একটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠে। কিন্তু কৃষক যদি ন্যায্যমূল্য না পান, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

নরসিংহপুর গ্রামের পাইকার কফিল উদ্দিন জানান, “প্রতিদিন দুই ট্রাক কাঁঠাল সিলেটে পাঠাই। শুধু আমি নই, আরও অনেক ব্যবসায়ী বিভিন্ন জেলায় কাঁঠাল পাঠাচ্ছেন। এই ব্যবসার ওপর বহু পরিবারের জীবিকা নির্ভরশীল।”

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, কাপাসিয়ার কাঁঠালের সুগন্ধ ও স্বাদ অন্য অঞ্চলের তুলনায় আলাদা হওয়ায় এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে উৎপাদন বেশি হলে বাজারে দাম ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

চৌকারচালা বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, “মৌসুমের শুরুতে বড় একটি কাঁঠাল ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এখন একই কাঁঠাল ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।”

শুধু দেশের বাজারেই নয়, প্রবাসী বাংলাদেশিদের চাহিদা মেটাতে যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, জাপানসহ বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি হচ্ছে কাপাসিয়ার কাঁঠাল। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, রপ্তানির সুফল সরাসরি তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁঠাল শুধু একটি ফল নয়; এটি অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য। কাঁঠালের কোয়া, বীজ ও কাঁচা কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদন সম্ভব। আধুনিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলে অপচয় কমবে এবং কৃষকরাও অধিক লাভবান হবেন।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোখলেছুর রহমান জানান, কাপাসিয়া উপজেলায় বর্তমানে ১ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের আবাদ হয়েছে। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও সম্ভাব্য উৎপাদন প্রায় ৭৬ হাজার ৩৪০ মেট্রিক টন। তিনি বলেন, “কাঁঠাল উৎপাদনে কাপাসিয়া দেশের অন্যতম শীর্ষ উপজেলা। সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা আরও উন্নত করা গেলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং কাঁঠালভিত্তিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।”

স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে কাঁঠাল সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন, সংরক্ষণাগার নির্মাণ, সহজ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি সুবিধা বৃদ্ধি করা হলে জাতীয় ফল কাঁঠালকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।

প্রকৃতির আশীর্বাদে উৎপাদনের দিক থেকে সমৃদ্ধ কাপাসিয়া। তবে উৎপাদনের এই সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন গাছে ঝুলে থাকা সোনালি কাঁঠালের ন্যায্যমূল্য কৃষকের ঘরেও পৌঁছাবে। সেই প্রত্যাশাতেই দিন গুনছেন উপজেলার হাজারো কাঁঠালচাষি।





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy