
X
আবু আনাস সিদ্দিকী বাঁধন
মেধা, অধ্যবসায়, সততা এবং অদম্য আত্মবিশ্বাস—এই চারটি গুণ একসঙ্গে মিললে সাফল্য যে অনিবার্য, তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার কৃতী সন্তান আবু আনাস সিদ্দিকী বাঁধন। প্রত্যন্ত জনপদ থেকে উঠে এসে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়ে তিনি এবার অর্জন করেছেন এক অনন্য সাফল্য। ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে মেধাতালিকায় ৪৪তম স্থান এবং ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে তিনি শুধু নিজের পরিবার নয়, পুরো বানিয়াচং তথা হবিগঞ্জ জেলার গর্বে পরিণত হয়েছেন।
বানিয়াচং উপজেলার মজলিশপুর গ্রামের এক সৎ, শিক্ষানুরাগী ও মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম বাঁধনের। তাঁর বাবা আবু সাহেদ দীর্ঘদিন দেশের শীর্ষ উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে সম্প্রতি অবসরে গেছেন। মা সাবিনা আক্তার বর্তমানে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি)-এর কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। বাবা-মায়ের সততা, মূল্যবোধ ও শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগই বাঁধনের জীবন গঠনের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
শৈশব থেকেই মেধার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন তিনি। মীর মহল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জনের পাশাপাশি পুরো বানিয়াচং উপজেলায় সম্মিলিত মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
বানিয়াচং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৩ সালে জেএসসিতে জিপিএ-৫ ও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করেন। ২০১৬ সালে একই বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫, ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি এবং সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সম্মিলিত মেধাতালিকায় ১৭তম স্থান অর্জন করে নিজের অসামান্য মেধার পরিচয় দেন। পরে সিলেট এমসি কলেজ থেকে ২০১৮ সালে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ ও সাধারণ বৃত্তি লাভ করেন।
উচ্চমাধ্যমিকের পর দেশের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভর্তি পরীক্ষায়ও ছিল তাঁর চমকপ্রদ সাফল্য। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা (ইউআরপি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (সাস্ট)-এর কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান তিনি। প্রযুক্তির প্রতি গভীর আগ্রহ থেকে শেষ পর্যন্ত সাস্টের সিএসই বিভাগে ভর্তি হন এবং ২০২৪ সালে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক (অনার্স) সম্পন্ন করেন।
বাঁধনের সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি আলোকিত ও অনুপ্রেরণাদায়ী পারিবারিক পরিবেশ। তাঁর বড় বোন সাঈমা আক্তার সুরমা ৪১তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে হবিগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। তাঁর দুলাভাই মো. কামরুল ইসলাম ৩৮তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে বৃন্দাবন সরকারি কলেজে দায়িত্ব পালন করছেন। পরিবারের এই সাফল্যের ধারাবাহিকতাকেই নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন বাঁধন।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবু আনাস সিদ্দিকী বাঁধন বলেন, “সাফল্যের কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই। বাবা-মায়ের আদর্শ, শিক্ষকদের আন্তরিক দিকনির্দেশনা এবং নিজের লক্ষ্যকে ঘিরে নিরলস পরিশ্রমই আমাকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। আমি প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে দেশের মানুষের কল্যাণে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে চাই।”
স্থানীয় শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, সহপাঠী ও সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, বাঁধনের এই অসাধারণ অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি বানিয়াচংয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন স্বপ্ন দেখার প্রেরণা। তাঁর সাফল্য প্রমাণ করেছে—সুযোগ সীমিত হলেও দৃঢ় সংকল্প, কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে দেশের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়ও সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।
প্রত্যন্ত জনপদ থেকে জাতীয় অঙ্গনে নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখে আবু আনাস সিদ্দিকী বাঁধন আজ শুধু একটি নাম নন; তিনি হাজারো স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণীর জন্য এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণার প্রতীক এবং বানিয়াচংয়ের গর্বিত সাফল্যের এক আলোকবর্তিকা।