
X
ছবি: প্রতিনিধি
প্রান্তিক পর্যায়ে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ২০২২ সালে প্রায় এক কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে দোতলা ভবন নির্মাণ করে সরকার। ভবনের কাঠামো অনুযায়ী একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, একজন উপসহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন ফার্মাসিস্টসহ অন্তত ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা। রয়েছে নরমাল ডেলিভারিসহ তিন শয্যার ওয়ার্ড ও আবাসিক সুব্যবস্থা। কিন্তু সেখানে প্রধান ফটকের তালা খুলে বসে থাকেন শুধু একজন আয়া। চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ফিরে যান রোগীরা। ওড়ে না জাতীয় পতাকাও।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর যদুবয়রা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে শনিবার (২৭ জুন) সকাল ১০টা ১৬ মিনিটে সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে। অথচ সকাল ৮টার মধ্যে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিত থাকার কথা।
এ সময় আয়া আবেদা খাতুন বলেন, ‘ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের কোনো ডাক্তার নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের শুধু একজন স্যাকমো সিয়াম আছেন। তিনিও অসুস্থ থাকায় শনিবার আসেন না। শুধু চাকরি বাঁচানোর জন্য বিকেল ৩টা পর্যন্ত খুলে বসে থাকি। রোগীরা এসে সারাদিন অপেক্ষা করে ফিরে যান।’
এদিন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসা রোগী আমেনা খাতুন বলেন, ‘শরীরে জ্বর-সর্দি। সকালেই এসে বসে আছি। ১০টার দিকে আয়া এসে দরজার তালা খুলল। এখন বলছে, ডাক্তার আসবেন না। এত কষ্ট করে এসে এখন খালি হাতে ফিরে যাব।’
তিনি যদুবয়রা গ্রামের দিনমজুর আতিয়ার রহমানের স্ত্রী।
দুই সন্তানের পর আবারও পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা যদুবয়রা স্কুলপাড়ার ভ্যানচালক রাকিবের স্ত্রী শারমিন আক্তার। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘সরকার এত টাকা দিয়ে ভবন করেছে। অথচ একদিনও মহিলা ডাক্তার আসেন না। ঠিকঠাক ওষুধও পাওয়া যায় না। শনিবারে মহিলা-পুরুষ কোনো ডাক্তারই থাকেন না। মানুষ এসে ফিরে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘হয় ভালোভাবে সেবা দিক, নয়তো হাসপাতাল বন্ধ করে দিক।’
জানতে চাইলে মুঠোফোনে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির উপসহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (স্যাকমো) মিজানুর রহমান সিয়াম জানান, প্রায় তিন মাস ধরে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে তিনি অসুস্থ। সপ্তাহে তিন দিন আসেন। অন্য দিন অন্য জায়গা থেকে দুজন আসেন।
তিনি বলেন, ভবন থাকলেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে প্রয়োজনীয় জনবল নেই। তিনি একাই কখনও চিকিৎসক, কখনও ফার্মাসিস্ট, আবার কখনও ঝাড়ুদারের দায়িত্ব পালন করেন।
জানা গেছে, প্রায় তিন বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত যদুবয়রা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। এটি একসময় নেদারল্যান্ডসের একটি সংস্থার আওতায় ছিল। সংস্থাটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতায় আসে। সেখানে একটি জরাজীর্ণ ভবনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সীমিত জনবল দিয়ে সেবা চলছিল।
পরে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র হিসেবে পূর্ণাঙ্গ সেবা চালুর লক্ষ্যে ২০২০ সালে প্রায় এক কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে দোতলা ভবন নির্মাণ করে সরকার। ভবনটি ২০২২ সালে উদ্বোধন করা হলেও এখন পর্যন্ত জনবল নিয়োগ হয়নি। ফলে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবকাঠামো থাকলেও জনবল নেই। আবার যাঁরা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাঁরাও সময়মতো আসেন না। চাহিদামতো ওষুধও মেলে না। ফলে সেবা না পেয়ে প্রতিদিনই ফিরে যাচ্ছেন রোগীরা। দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর দাবি জানান তাঁরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সান্দিয়ারা-লাহিনীপাড়া জিকে খালসংলগ্ন সড়কের পাশে অবস্থিত যদুবয়রা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। সেখানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে দুটি আবাসিক ভবন ও একটি স্বাস্থ্যভবন। দোতলা নতুন ভবনটিতে সুনসান নীরবতা। ওড়েনি জাতীয় পতাকা। বসে আছেন আয়া ও রোগীরা। নিচতলায় চিকিৎসক কক্ষ, ফার্মাসিস্ট কক্ষ, ওয়ার্ড, নরমাল ডেলিভারি কক্ষ ও ওয়াশরুমের দরজায় ঝুলছে তালা। দ্বিতীয় তলায় দুটি আবাসিক কক্ষ। ব্যবহার না হওয়ায় সেখানে ময়লা-আবর্জনা জমেছে এবং মাকড়সার জাল পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হাসিনা খাতুন বলেন, ‘১০টা-১১টার আগে ডাক্তার আসেন না। আসলেও ওষুধ পাওয়া যায় না। গর্ভবতী নারীরা কোনো সেবা পান না। এখানে সেবা চালু হলে তাঁদের আর কুমারখালী বা কুষ্টিয়ায় যেতে হতো না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, ‘ডাক্তার আসেন না। একজন আয়া তালা খুলে বসে কাঁথা সেলাই করেন। মানুষ কষ্ট করে এসে ফিরে যায়। এসব দেখার যেন কেউ নেই।’
যদুবয়রা জয়বাংলা বাজারের ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে ভবন করেছে। থাকা ও চিকিৎসার সুব্যবস্থা করেছে। কিন্তু ডাক্তার না থাকায় সব নষ্ট হচ্ছে। মানুষের চরম ভোগান্তি হচ্ছে।’ দ্রুত পূর্ণাঙ্গ সেবা চালুর দাবি জানান তিনি।
অবকাঠামো থাকলেও ভবনটি স্বাস্থ্য বিভাগের বলে জানান উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এস. এম. সানবিম সোহান। তিনি বলেন, জনবল সংকটের কারণে শুধু একজন ভিজিটর মাসে এক দিন রোগী দেখেন। এতে স্বাভাবিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক শামীমা আক্তার বলেন, জনবল নেই। একজন স্যাকমো সেবা দিচ্ছিলেন। তিনিও অসুস্থ থাকায় সেবা বন্ধ রয়েছে। সরকারি ভবন বন্ধ রাখারও সুযোগ নেই। তাই আয়া তালা খুলে বসে থাকেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে জনবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন চিকিৎসক শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন।
জনবল সংকটে সেবা ব্যাহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার। তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।