থানচিতে পরিত্যক্ত টিনশেড থেকে জাতীয়করণের পথে তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়

মংহাইথুই মারমা, বান্দরবান প্রতিনিধি

সারাবাংলা

বান্দরবানের দুর্গম থানচি উপজেলার তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পথচলা। পরিত্যক্ত একটি

2026-07-02T11:13:32+00:00
2026-07-02T11:13:32+00:00
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬
   
থানচিতে পরিত্যক্ত টিনশেড থেকে জাতীয়করণের পথে তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়
মংহাইথুই মারমা, বান্দরবান প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ১১:১৩ এএম   (ভিজিট : ১০৮)
ছবি: প্রতিনিধি
X

ছবি: প্রতিনিধি

বান্দরবানের দুর্গম থানচি উপজেলার তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পথচলা। পরিত্যক্ত একটি টিনশেড ঘরে যাত্রা শুরু করা বিদ্যালয়টি আজ জাতীয়করণের সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে। সরকারের জাতীয়করণের ঘোষণায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মাঝে আনন্দের সঞ্চার হলেও দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে পাঠদান করে আসা শিক্ষকরা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে তিন্দু গ্রুপিংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরোনো পরিত্যক্ত টিনশেড ভবন সংস্কার করে সেখানে তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৯ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হওয়ার পর পুরোনো ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।

তৎকালীন তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মংপ্রুঅং মারমার অর্থায়ন ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতেই পাঁচজন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয় এবং রেমাক্রী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং (মিংলেন)-কে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

২০২২ সালে চেয়ারম্যান পরিবর্তনের পর নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা বিদ্যালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিদ্যালয়ের আয় বৃদ্ধি ও শিক্ষক বেতন প্রদানের লক্ষ্যে তিনি একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা (ইঞ্জিন বোট) প্রদান করেন। বর্তমানে সেই বোট পরিচালনা করে অর্জিত আয় দিয়েই বিদ্যালয়ের পরিচালনা ব্যয় ও শিক্ষকদের বেতনের ব্যবস্থা করা হয়।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের জীর্ণ টিনশেড ভবনের চারটি কক্ষের মধ্যে তিনটিতে পাঠদান চলছে এবং একটি কক্ষ অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পেছনের একটি কক্ষ ছাত্রাবাসের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে নবম শ্রেণিতে ৪ জন, অষ্টম শ্রেণিতে ৮ জন, সপ্তম শ্রেণিতে ৯ জন এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৮ জনসহ মোট ২৯ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত পাওয়া যায়। তবে বিদ্যালয়ের নথিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫২ জন উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়া সরেজমিনে ৫জন শিক্ষক উপস্থিত থাকলেও কাগজে-কলমে ৮ জন শিক্ষকের নাম রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তালিকাভুক্ত অনেক শিক্ষক অন্যত্র কর্মরত রয়েছেন।

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের পাশে তিনতলা ফাউন্ডেশনের একটি নতুন ভবনের প্রথম তলার নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।

সহকারী শিক্ষক পাওং ম্রো বলেন, "২০২০ সালে মাসিক ১০ হাজার টাকা বেতনে যোগদান করলেও প্রায় ৪০ মাস কোনো বেতন পাইনি। এলাকার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের কথা ভেবেই পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি। বেতন না পাওয়ায় শিক্ষক নিবন্ধন ও বি.এড. সম্পন্ন করাও সম্ভব হয়নি।"

তিনি আরও বলেন, আমাদের মতো পাঁচজন শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে কাজ করছি। তবে কাগজে-কলমে আরও ১৩ জন শিক্ষকের নাম রয়েছে, যাদের অনেকেই অন্যত্র চাকরি করেন। জাতীয়করণ হলে বাস্তবে কর্মরত শিক্ষকরা সুযোগ পাবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী পংএ খুমী, নাংথং ম্রো, থুইমেচিং মারমা ও চন্দ্রা ত্রিপুরা জানায়, তাদের অধিকাংশের পরিবার দরিদ্র হওয়ায় অনেক সময় লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। জাতীয়করণের ঘোষণা তাদের নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

তারা বলে, আমরা লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হতে চাই। জাতীয়করণ হলে আমাদের মতো দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীরা আরও ভালো সুযোগ পাবে।

এদিকে জাতীয়করণের জন্য নির্ধারিত শর্তগুলো নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাতীয়করণের ক্ষেত্রে নিজস্ব জমি, অন্তত ১২০ জন শিক্ষার্থী, মানসম্মত স্থায়ী ভবন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, শৌচাগার, নিবন্ধিত শিক্ষক, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং পরিচালনা কমিটির নির্ধারিত যোগ্যতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব শর্ত পূরণে দেশের অনেক দুর্গম এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবে উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো পরিচালিত হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল সংকট এখনো কাটেনি। প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে।

সহকারী শিক্ষক পুচিংমং মারমা বলেন, দীর্ঘ ছয় থেকে সাত বছর ধরে বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করা শিক্ষকরা জাতীয়করণের কঠোর শর্তের কারণে বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন।

সহকারী শিক্ষিকা কাইলং খুমী ও নাংছুং খুমী বলেন, জাতীয়করণের সময় শুধু অবকাঠামো নয়, দীর্ঘদিন ধরে ত্যাগ স্বীকার করে পাঠদান করে আসা শিক্ষকদের বাস্তব অবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

অভিভাবক চিংথোয়াইপ্রু মারমা বলেন, জাতীয়করণের ঘোষণা দুর্গম এলাকার মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। তবে যারা বছরের পর বছর বিনা বেতনে পাঠদান করেছেন, তাদের যেন অবমূল্যায়ন না করা হয়।

প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং (মিংলেন) বলেন, আমি এই দুর্গম এলাকার সন্তান। এখানে এসএসসি পাস শিক্ষার্থীও একসময় পাওয়া কঠিন ছিল। তাই যত কষ্টই হোক, বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে আজীবন কাজ করে যাব। ইঞ্জিন বোট পরিচালনা করে শিক্ষকদের বেতনের ব্যবস্থা করছি। জাতীয়করণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন কর্মরত শিক্ষকদের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করার অনুরোধ জানাই।

তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, দুর্গম এই ইউনিয়নে শিক্ষা বিস্তারের জন্য বিদ্যালয়টির জাতীয়করণ অত্যন্ত প্রয়োজন। আমরা সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই এবং দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা শিক্ষক ও স্থানীয় জনগণের বিষয়টিও ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আহ্বান জানাই।





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy