
X
ফাইল ছবি
ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে। বিলাসবহুল অট্টালিকা, হোটেল, গলফ ক্লাবসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি আলোচনায় রয়েছেন।
তবে সম্প্রতি প্রকাশিত তার আর্থিক বিবরণ নতুন করে বিশ্বব্যাপী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এতে দেখা যায়, সম্পদের পাশাপাশি আয়ের দিক থেকেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্য সব প্রেসিডেন্টকে ছাড়িয়ে গেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নৈতিকতা দপ্তরে জমা দেওয়া ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানায়, গত এক বছরে ট্রাম্পের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে উঠেছে ডিজিটাল মুদ্রাভিত্তিক ব্যবসা। শুধু এই খাত থেকেই তিনি প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছেন। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান থেকেই এসেছে প্রায় ৮০০ কোটি ডলার।
এছাড়া তার নামে চালু হওয়া বিভিন্ন ডিজিটাল মুদ্রা বিক্রি থেকেও এসেছে আরও কয়েকশ কোটি ডলার। অল্প সময়ের মধ্যে একটি নতুন খাত থেকে এত বিপুল পরিমাণ আয় এর আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু নতুন খাতই নয়, ট্রাম্পের পুরোনো ব্যবসাগুলোও সমানভাবে লাভজনক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে থাকা তার গলফ ক্লাব, অবকাশযাপন কেন্দ্র, হোটেল এবং বাণিজ্যিক ভবন থেকে এখনও নিয়মিত বিপুল অর্থ আসছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে শুধু তার গলফ ক্লাব ও অবকাশযাপন কেন্দ্রগুলো থেকেই পাঁচশ কোটি ডলারের বেশি আয় হয়েছে। ফ্লোরিডায় অবস্থিত তার বিখ্যাত ব্যক্তিগত ক্লাব থেকেও এসেছে কয়েক কোটি ডলার।
এতেই শেষ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে ট্রাম্প আরও বিপুল অর্থ আয় করেছেন। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং ইউরোপের একাধিক প্রকল্পে তার প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। এসব চুক্তি থেকেও প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার তার আয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
বিবিসির বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে বড় পরিবর্তন এসেছে। এক সময় যেখানে আয়ের মূল ভিত্তি ছিল জমি, ভবন এবং হোটেল, সেখানে এখন নতুন প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক খাত বড় ভূমিকা পালন করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের কারণেই তার সম্পদের পরিমাণ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক দ্রুত বেড়েছে।
ইতিহাসের অন্যান্য মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মূল্যস্ফীতির হিসাব যোগ করলেও সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডির সম্পদের পরিমাণ ছিল আনুমানিক একশ কোটি ডলারের কিছু বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের সম্পদ ছিল কয়েকশ কোটি ডলারের সমপরিমাণ। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মোট সম্পদের মূল্য এখন কয়েক হাজার কোটি ডলার। অর্থাৎ সম্পদের বিচারে তিনি আগের সব মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বড় ব্যবধানে ছাড়িয়ে গেছেন।
তবে এই বিপুল সম্পদের সঙ্গে বিতর্কও রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, একজন দায়িত্বে থাকা প্রেসিডেন্টের এত বড় ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য থাকলে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে নতুন আর্থিক খাতে তার ব্যাপক সম্পৃক্ততা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। যদিও হোয়াইট হাউস এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ট্রাম্প তার ব্যবসাগুলো সরাসরি পরিচালনা করেন না। সেগুলোর দেখভাল করেন তার পরিবারের সদস্য ও নিযুক্ত ব্যবস্থাপকরা।
সবকিছু মিলিয়ে ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণ শুধু একজন ব্যবসায়ীর আয়ের হিসাব নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কারণ এই নথিই দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে ব্যবসা, প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বিনিয়োগ, বিলাসবহুল স্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তির সমন্বয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক সম্পদের মালিক হয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্য কোনো প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। আর সে কারণেই তাকে এখন শুধু সাবেক বা বর্তমান প্রেসিডেন্ট হিসেবেই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী প্রেসিডেন্ট হিসেবেও উল্লেখ করা হচ্ছে।