জুরাছড়িতে স্বেচ্ছাশ্রমে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

জুরাছড়ি প্রতিনিধি

সারাবাংলা

ভোরের নরম আলো তখন পাহাড়ের সবুজে ছড়িয়ে পড়ছে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে চলেছেন একদল নারী-পুরুষ। কারও হাতে

2026-07-02T20:31:54+00:00
2026-07-02T20:31:54+00:00
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬
   
জুরাছড়িতে স্বেচ্ছাশ্রমে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
জুরাছড়ি প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৮:৩১ পিএম   (ভিজিট : ২৭)
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
X

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

ভোরের নরম আলো তখন পাহাড়ের সবুজে ছড়িয়ে পড়ছে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে চলেছেন একদল নারী-পুরুষ। কারও হাতে গাছের চারা, কারও মাথায় বাঁশের ঝুড়ি। কারও হাতে দা, কারও হাতে কোদাল। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, তাঁরা হয়তো নিজেদের জমিতে ফলের বাগান করতে যাচ্ছেন। কিন্তু একটু কাছে গেলেই বোঝা যায়, তাঁদের গন্তব্য ব্যক্তিগত কোনো জমি নয়; পাহাড়ের মৌজা বন। নিজেদের জন্য নয়— বরং বন্যপ্রাণীর খাদ্যসংকট দূর করা, বনকে সমৃদ্ধ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ সবুজ আবাস গড়ে তোলা।

রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলার, বনযোগীছড়া ইউনিয়নের- হাল্যারাম পাড়ার বাসিন্দারা, এভাবেই স্বেচ্ছাশ্রমে বনযোগীছড়া মৌজা বনে, ফলজ ও বনজ চারা রোপণ করেছেন। নারী, যুবক ও প্রবীণ—সব মিলিয়ে প্রায় ২০ জনের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ কর্মসূচি, পাহাড়ে বন সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণের দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। 

অংশগ্রহণকারী নন্দ চাকমার ভাষ্য, পাহাড়ে বন কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক খাদ্যের উৎসও কমে যাচ্ছে। ফলে অনেক প্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে, সৃষ্টি হচ্ছে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর দ্বন্দ্ব। সেই বাস্তবতা থেকেই তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বনের ভেতরে এমন সব দেশীয় ফলজ গাছ লাগাবেন, যেগুলো বড় হলে পাখি, বানর, কাঠবিড়ালি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর খাদ্যের জোগান দেবে। এ কর্মসূচিতে রোপণ করা হয়েছে জাম, গুটগুটি, জলপাই, হরীতকী, কাঁঠাল, লটকন, কাওফল, তেঁতুল, আমসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির চারা। স্থানীয়দের বিশ্বাস, কয়েক বছরের মধ্যেই এসব গাছ শুধু বনকে সবুজে ভরিয়ে তুলবে না, বন্যপ্রাণীর জন্যও প্রাকৃতিক খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠবে।

বনযোগীছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তোষ বিকাশ চাকমা বলেন, “সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া বন রক্ষা সম্ভব নয়। হাল্যারাম পাড়ার মানুষ যে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তা অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে।”

মৌজা বনের সভাপতি ও স্থানীয় হেডম্যান করুণা ময় চাকমা বলেন, “এই বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়; এটি আমাদের পানি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও সংস্কৃতির অংশ। বন টিকিয়ে রাখতে হলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ বন পেয়ে বড় হোক।” 

বনযোগীছড়া মৌজা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি সালমা আক্তার জানান, “শুধু চারা লাগালেই হবে না, এগুলো পরিচর্যা করাও আমাদের দায়িত্ব। তাই স্থানীয়দের নিয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হবে।”

বন্যপ্রাণী উদ্ধার দলের সদস্য জেনি চাকমা বলেন, “বন্যপ্রাণী রক্ষা করতে হলে তাদের প্রাকৃতিক আবাস ও খাদ্যের উৎস সংরক্ষণ করতে হবে। এই ধরনের উদ্যোগ মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ি এলাকায় দেশীয় ফলজ গাছের সংখ্যা বাড়লে জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হয়, মাটির ক্ষয় কমে, পানির উৎস সংরক্ষিত থাকে এবং বন্যপ্রাণীর জন্য প্রাকৃতিক খাদ্যের জোগান বৃদ্ধি পায়। ফলে বন ও মানুষের মধ্যে একটি টেকসই সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্পের জেলা কর্মকর্তা কামনাশীষ খীসা বলেন, “জুরাছড়ি, বরকল, রাঙামাটি সদর, বিলাইছড়িসহ দশ উপজেলায় পাহাড়িদের সংরক্ষিত পাড়াবনে প্রায় ২৫ হাজার স্থানীয় প্রজাতির চারা রোপণ করা হচ্ছে।” 

উল্লেখ্য, ‘গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা’র অর্থায়নে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ই.আর.আর.ডি-সিএইচটি এবং ইউএনডিপি’র সহযোগিতায় রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় এসব চারা সরবরাহ করা হয়েছে। 

পাহাড়ের নীরব সবুজের মাঝে হাল্যারাম পাড়ার মানুষের এই স্বেচ্ছাশ্রমের গল্প মনে করিয়ে দেয়- প্রকৃতি রক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো বড় প্রকল্প নয়, বরং মানুষের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্মিলিত উদ্যোগ।





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy