
X
অনুমোদনহীন জ্বালানি বিক্রি
হবিগঞ্জে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল অনুমোদনহীনভাবে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জেলার মোট ব্যবহৃত জ্বালানির বড় একটি অংশ লাইসেন্সবিহীন দোকানের মাধ্যমে বাজারজাত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন যানবাহনের ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ ও সরকারের রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ছে।
জানা গেছে, জেলায় প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার লিটার জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। অথচ অনুমোদিত ফিলিং স্টেশনগুলোতে বিক্রি হওয়া জ্বালানির পরিমাণ সেই চাহিদার তুলনায় অনেক কম। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার লিটার জ্বালানি বিভিন্ন অনুমোদনহীন বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার লিটার পেট্রল, ৬৫ হাজার লিটার অকটেন এবং ১ লাখ ৩০ হাজার লিটার ডিজেল।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার পাশেই বোতল ও জারভর্তি জ্বালানি তেল প্রকাশ্যে বিক্রি হতে দেখা যায়। আনোয়ারপুর বাইপাস, লাখাই সড়ক, ফায়ার সার্ভিস সড়ক, উমেদনগর, নবীগঞ্জ সড়ক ও বানিয়াচং সড়কে এমন চিত্র চোখে পড়ে।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা সাইফুল রাজু জানান, মোটরসাইকেলে স্থানীয় একটি দোকান থেকে জ্বালানি নেওয়ার পর গাড়িতে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয়। পরে মেকানিক তাকে জানান, নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারের কারণে ইনজেক্টর ও ফুয়েল পাম্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হবিগঞ্জ শহরের দীর্ঘদিনের মোটরসাইকেল মেকানিক ছগির আহমদের ভাষ্য, নিম্নমানের বা অপরিশোধিত জ্বালানি ব্যবহারে ইঞ্জিনে দ্রুত কার্বন জমে যায়। ফলে ইনজেক্টর, ফুয়েল পাম্পসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হয়, জ্বালানি খরচ বাড়ে এবং ইঞ্জিনের স্থায়িত্ব কমে যায়। এমন সমস্যার গ্রাহক প্রায় প্রতিদিনই তার কাছে আসেন বলেও জানান তিনি।
হবিগঞ্জ পেট্রোলিয়াম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মাহবুবুর রহমান চৌধুরী বলেন, জেলার ১৯টি ফিলিং স্টেশনে বছরে প্রায় ১৫ কোটি টাকার জ্বালানি বিক্রি হয়, যেখান থেকে সরকার প্রায় ৪০ লাখ টাকা রাজস্ব পায়। তার দাবি, একই পরিমাণ জ্বালানি যদি অনুমোদনহীনভাবে বিক্রি হয়ে থাকে, তাহলে বছরে অর্ধকোটি টাকারও বেশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
নিয়ম অনুযায়ী জ্বালানি বিক্রির জন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের অনুমোদনসহ নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু জেলার অধিকাংশ খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে এসব শর্ত মানা হচ্ছে না। অনেক দোকানের লাইসেন্স নেই, আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের অনুমতির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারে অতিরিক্ত কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড ও ক্ষতিকর বস্তুকণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হবিগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শ্যামল পুরকায়স্থ জানান, নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি অতিরিক্ত দামে জ্বালানি বিক্রির দায়ে এক দোকানিকে জরিমানা করা হয়েছে। তবে বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে পুরো অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুমোদনহীন জ্বালানি বিক্রি বন্ধ করতে হলে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত অভিযান, কঠোর নজরদারি এবং কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত জরুরি।