শাহজাদপুরে যমুনার ভয়াবহ তাণ্ডবে নিঃস্ব চরের শত শত মানুষ

শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি

সারাবাংলা

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার দুটি ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামে যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। গ্রামগুলো হলো সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর,

2026-07-03T13:10:32+00:00
2026-07-03T13:10:32+00:00
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬
   
শাহজাদপুরে যমুনার ভয়াবহ তাণ্ডবে নিঃস্ব চরের শত শত মানুষ
শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬, ১:১০ পিএম   (ভিজিট : ৫৫)
ছবি: প্রতিনিধি
X

ছবি: প্রতিনিধি

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার দুটি ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামে যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। গ্রামগুলো হলো সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর, ধীতপুর, কুরসি, বারপাখিয়া এবং গালা ইউনিয়নের মোহনপুর ও বৃ-হাতকোড়া। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ভয়াবহ ভাঙনের তাণ্ডবে এই ছয়টি গ্রামের অধিকাংশ ফসলি জমি, বাড়িঘর, মসজিদ ও মাদ্রাসা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট যেটুকু রয়েছে, তাও বিলীন হওয়ার পথে। গত এক মাস আগেও যেখানে বাড়িঘর ছিল, এখন সেখানে অথৈ পানি।

এখানকার জমিতে প্রচুর পরিমাণে পটল, বেগুন, ধান, বাদাম, মাষকলাই, সরিষা, ইরি-বোরো, বাঙ্গি, সবজি, ধনিয়াসহ সব ধরনের ফসল উৎপন্ন হয়ে থাকে। এছাড়া এখানকার কৃষকেরা ষাঁড় গরু, ছাগল-ভেড়া ও হাঁস-মুরগি লালন-পালন করে বাড়তি আয় করেন। ফলে যমুনা নদীবেষ্টিত সোনাতনী ইউনিয়নের মানুষ আগের চেয়ে অনেক স্বচ্ছল হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এখানে নতুন করে যমুনা নদীর ভাঙন শুরু হয়েছে। ফলে এ এলাকার অধিকাংশ ফসলি জমি ও বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে কৃষকেরা নতুন করে ভাঙনের কবলে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

এ বিষয়ে ধীতপুর গ্রামের শতবর্ষী রহিতন বেগম বলেন, জন্মের পর ছোটবেলা থেকেই বাবার বাড়িতে কষ্ট করেছি। আবার বিয়ের পর স্বামী গরিব হওয়ায় সেখানেও কষ্ট করেছি। এ জীবনে সুখ কী জিনিস, তা পেলাম না। এখন এই বয়সে এসে যমুনা নদীর ভাঙনে বাড়িঘর হারিয়ে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে কষ্ট করছি।

তিনি বলেন, যমুনা নদীতে সবকিছু হারিয়ে তিনি এখন নিঃস্ব। তার থাকার মতো একটি ঘরও নেই। পাঁচ টিনের একটি জীর্ণ ছাপড়াঘরে স্বামীহারা এক মেয়েকে নিয়ে থাকেন। জমির আইল থেকে শাকপাতা তুলে অথবা বরশি দিয়ে নদী থেকে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়েই তাদের মা-মেয়ের জীবন-জীবিকা চলে।

তিনি আরও বলেন, তার বয়স এখন ১২০ বছরের বেশি। এ বয়সেও তার কপালে জোটেনি ভাতার কার্ড। একটি গরম কাপড়ের অভাবে তীব্র শীতে তার রাত কাটে। রাক্ষুসী যমুনা তার সব সুখ কেড়ে নিয়েও শান্ত হয়নি। আবারও তার একমাত্র জীর্ণ ছাপড়াঘরের দিকে থাবা বাড়িয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে সেটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে তিনি কোথায় যাবেন, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

এ বিষয়ে ধীতপুর মসজিদের ইমাম আব্দুল আলীম বলেন, এই চরে প্রচুর পরিমাণে পটল, বেগুন, ধান, বাদাম, মাষকলাই, সরিষা, ইরি-বোরো, বাঙ্গি, সবজি, ধনিয়াসহ সব ধরনের ফসল চাষ হয়। নানা ফসল চাষ করে এ চরের মানুষ ভালোভাবেই জীবনযাপন করছিলেন। এখন প্রায় সবারই বাড়িঘর ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে তারা সর্বস্ব হারিয়ে অন্যের জমিতে ঘর তুলে বসবাস করছেন। আবারও তারা ভাঙনের কবলে পড়ায় চরম দুর্বিপাকে পড়েছেন। তারা এখন কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবেন, কী খাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

এ বিষয়ে ওই গ্রামের শামছুল হক জানান, এ পর্যন্ত সাতবার তার বাড়িঘর ও ফসলি জমি যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আবারও তিনি ভাঙনের কবলে পড়েছেন। এখন তার রাত কাটে ভাঙন আতঙ্কে।

এ বিষয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, সোনাতনীর বালুমাটি সোনার মতোই ছিল। এই বালুমাটিতে যা বুনেছি, তাই ভালো জন্মেছে। শাকসবজি ও তরিতরকারি চাষ করে আমাদের সংসার ভালোই চলছিল। এখন ভাঙনের কবলে পড়ে সবকিছু নদীতে চলে যাচ্ছে। ফলে আমরা সবকিছু হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছি। এখন আমরা কোথায় যাব, কী খাব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।

এ গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, গত তিন-চার মাসে সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর থেকে বারপাখিয়া পর্যন্ত ছয়টি গ্রামের প্রায় ৩০০-৪০০ বাড়িঘর যমুনা নদীগর্ভে চলে গেছে। এই ভাঙন রোধে এখানে দ্রুত বাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

এ বিষয়ে শাহজাহান আলী বলেন, ভাঙতে ভাঙতে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। ভাঙন রোধে কোনো সরকারই ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি বলেন, বিগত সরকার আমলে স্থানীয় এমপির কাছে আমরা ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিতে দরখাস্ত দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা তো এখন নেই। বিদায় নিয়েছে। এ সরকার যদি ব্যবস্থা নেয়, তাহলে আমরা বাঁচব। না হলে এভাবেই আস্তে আস্তে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।

এ বিষয়ে কুরসি গ্রামের ইয়াসিন মোল্লা বলেন, আমার গোষ্ঠীর প্রায় ৬০ বিঘা জমি যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এর মধ্যে আমার জমিই বেশি ছিল। আমি প্রায় ছয় বিঘা জমিতে সবজি আবাদ করতাম। ধান, ভুট্টা, টমেটো, লাউ, শশা, কুমড়া, বেগুন ও সরিষার ভালো আবাদ হতো। সব শেষ হয়ে গেছে। এখন থাকার একটু বাড়ি আছে, তাও যে কোনো মুহূর্তে নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। এটুকু চলে গেলে কোথায় থাকব, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি। তিনি সরকারের কাছে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে দ্রুত ভাঙন রোধের জোর দাবি জানান।

এ বিষয়ে ধীতপুর ঘোনাপাড়া গ্রামের হাফেজ উদ্দিন বলেন, যমুনা নদীর ভাঙনে কুরসি-ধীতপুর গরুর হাট, মসজিদ, মাদ্রাসা, বাড়িঘর ও ফসলি জমি—সবকিছু যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এই ভাঙন ঠেকাতে না পারলে মানুষ অসহায় হয়ে পড়বে। ভাঙন রোধে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এ ইউনিয়নটি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাবে। তাই সরকারের কাছে দ্রুত ভাঙন রোধের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

এ বিষয়ে জিন্নাহ মণ্ডল বলেন, ভোটের সময় এলে প্রার্থীরা মুখে মিষ্টি কথা বলেন, নির্বাচন চলে গেলে আর খবর থাকে না। গত সংসদ নির্বাচনেও কথা দিয়েছিলেন, নির্বাচিত হলে কুরসি-ধীতপুর চরের ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু এখনও তার কোনো নমুনা দেখতে পাচ্ছি না। ভাঙতে ভাঙতে গ্রাম শেষ হয়ে গেল, কিন্তু ভাঙন রোধের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তিনি চলতি বন্যায় এ ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, গত বছর এ দুটি ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামের অন্তত ২৫০ হেক্টর ফসলি জমি যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর বিপরীতে ৯০ হেক্টরের বেশি জমি জেগে উঠেছে। ফলে এ ইউনিয়নে জমির পরিমাণ তেমন একটা কমেনি। তবে যেসব ফসলি জমি নতুন করে ভেঙে যাচ্ছে, সেসব জমির মালিক তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা হলেও ক্ষতির মধ্যে পড়েছেন। তাই ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা সারমিন ও সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম ভিডিও বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে বলেছেন, খোঁজখবর নিয়ে এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা বলবেন।

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, চর রক্ষায় তাদের কোনো প্রকল্প নেই। তাই এখানকার ভাঙন রোধে তিনি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবেন না।





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy