টাঙ্গাইলে নিষ্ঠুরতার চাদর ছিঁড়ে মানবতার জয়

স্টাফ রিপোর্টার, টাঙ্গাইল

সারাবাংলা

জীবনের শেষ বেলায় নিজের রক্ত যখন স্বার্থের টানে হয়ে যায় পাথর, তখন এক পরম মমতার হাত এসে মুছে

2026-07-03T15:46:14+00:00
2026-07-03T15:46:14+00:00
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬
   
টাঙ্গাইলে নিষ্ঠুরতার চাদর ছিঁড়ে মানবতার জয়
স্টাফ রিপোর্টার, টাঙ্গাইল
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬, ৩:৪৬ পিএম   (ভিজিট : ১৬৮)
ছবি: প্রতিনিধি
X

ছবি: প্রতিনিধি

জীবনের শেষ বেলায় নিজের রক্ত যখন স্বার্থের টানে হয়ে যায় পাথর, তখন এক পরম মমতার হাত এসে মুছে দিল শতবর্ষী এক পিতার চোখ ফেটে বের হওয়া নোনা জল।

টাঙ্গাইলের বৈল্যা এলাকায় অন্ধকার রাতে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা অন্ধপ্রায় বৃদ্ধ মফিজ উদ্দিনের কান্নার অবসান ঘটেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপির তাৎক্ষণিক মানবিক হস্তক্ষেপে এবং পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে একবিংশ শতাব্দীর এক চরম অমানবিক অধ্যায়ের পর রচিত হলো মানবতার এক অনন্য গল্প।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টাঙ্গাইল শহরের এনায়েতপুর এলাকার বাসিন্দা মফিজ উদ্দিন তিন ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। প্রায় আট বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই তাঁর জীবন হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গ। এক ছেলে মারা গেছেন, বড় ছেলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত, আর ছোট ছেলে আলাদা সংসার করেন। জীবনের শেষ সম্বলটুকুও মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে দুই ছেলের নামে লিখে দিয়েছিলেন তিনি। এরপর থেকেই পরিবারে তাঁর অবস্থান ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এলাকাবাসী জানায়, তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত বড় ছেলে শামসুলের বাড়িতেই বসবাস করতেন। ছেলের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সেখানে নাতনি ও তার স্বামী থাকতেন। কিন্তু তারা বৃদ্ধ দাদার দেখাশোনা করতে চাননি। একপর্যায়ে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সন্ধ্যায় তাঁকে বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে যান।

এ খবর জানতে পেরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এবং বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেন। প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর কড়া নির্দেশনায় গভীর রাতেই ঘটনাস্থলে ছুটে যায় টাঙ্গাইল সদর থানা পুলিশ। সেতুর পাশে অসহায়ভাবে বসে থাকা বৃদ্ধ মফিজ উদ্দিনকে পরম যত্নে উদ্ধার করেন তারা। একই সঙ্গে এই চরম নিষ্ঠুরতার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেয় প্রশাসন। ঘটনার মূল কারিগর, বৃদ্ধের সেই পাষাণ নাতনিকে ইতোমধ্যেই থানা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। নিজের দাদাকে রাতের অন্ধকারে রাস্তায় ফেলে আসার মতো অমার্জনীয় অপরাধের জন্য এখন তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমদিকে শতবর্ষী বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে চরম অনাগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন ছোট মেয়ে রিনা বেগম। কিন্তু খোদ প্রতিমন্ত্রী যখন নিজে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন এবং একজন অভিভাবকের মতো পাশে দাঁড়ান, তখন গলতে শুরু করে রিনার ভেতরের দ্বিধার বরফ। প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাস ও স্নেহের পর অবশেষে নিজের ভুল বুঝতে পেরে বাবার সেবা ও দেখাশোনার পবিত্র দায়িত্ব নিতে পুরোপুরি সম্মত হন রিনা বেগম। পুলিশ রাতেই মফিজ উদ্দিনকে নিরাপদে তাঁর ছোট মেয়ে রিনা বেগমের জিম্মায় পৌঁছে দেয়। দীর্ঘ সময় পর এক হতভাগা পিতা ফিরে পান পরম আশ্রয়ের এক টুকরো আঁচল।

শুধু উদ্ধারের নির্দেশ দিয়েই নিজের দায়িত্ব শেষ করেননি প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপি; বরং তিনি এই অসহায় পিতার জন্য নিয়েছেন এক অনন্য মানবিক সিদ্ধান্ত। বৃদ্ধ মফিজ উদ্দিনের চিকিৎসা, খাবার, বাসস্থান এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যয়ভার এখন থেকে ব্যক্তিগতভাবে বহন করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এছাড়া মফিজ উদ্দিনের জন্য অতিদ্রুত সরকারি বৃদ্ধভাতার ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদি মেয়ের বাড়িতে কোনো কারণে সমস্যা হয়, তবে বৃদ্ধের থাকার জন্য আলাদা একটি নিরাপদ কক্ষ ভাড়া নেওয়া হবে এবং সেই ভাড়াসহ সব আনুষঙ্গিক খরচ নিয়মিতভাবে প্রতিমন্ত্রী নিজেই পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

যে পিতা নিজের শেষ সম্বলটুকুও মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে সন্তানদের নামে লিখে দিয়ে আজ পথের ফকির হয়েছিলেন, সন্তানদের চরম বিশ্বাসঘাতকতার পর আজ রাষ্ট্র এবং একজন জনপ্রতিনিধি তাঁর সেই হারানো সম্মান আর অধিকার ফিরিয়ে দিলেন। এই ঘটনা যেমন আমাদের সমাজের অন্ধকারের এক কুৎসিত রূপকে দেখায়, তেমনি প্রতিমন্ত্রীর এই বিশাল হৃদয়ের ছায়া আমাদের মনে বিশ্বাস জোগায়—পৃথিবীতে এখনো মানবিকতা ফুরিয়ে যায়নি।

টাঙ্গাইল সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিন বলেন, প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে। তিনি বর্তমানে তাঁর ছোট মেয়ের হেফাজতে রয়েছেন। নাতনিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে তার স্বামী পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান।

এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘একজন অসহায় বৃদ্ধকে এভাবে রাস্তায় ফেলে রেখে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত অমানবিক ও হৃদয়বিদারক। বাবা-মা আমাদের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তাঁদের অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। যত দিন প্রয়োজন, এই বৃদ্ধের চিকিৎসা, থাকা-খাওয়া ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার দায়িত্ব আমি নেব। একই সঙ্গে যারা তাঁকে এভাবে পরিত্যাগ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সমাজের প্রতিটি মানুষকে অসহায় প্রবীণদের পাশে দাঁড়াতে হবে।’





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy