
X
ফাইল ছবি
‘একটা স্বপ্নের করুণ মৃত্যু’—এভাবেই শেষ হলো নওগাঁর মান্দা উপজেলার এক তরুণীর জীবনের গল্প। প্রেম করে পরিবারের অমতে ঘর বেঁধেছিলেন। ভেবেছিলেন সুখের সংসার হবে। কিন্তু সেই প্রেমই কাল হলো ১৮ বছর বয়সী কলেজছাত্রী সাদিয়া আক্তার ফারজানার জীবনে। যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন এবং স্বামীর একাধিক পরকীয়ার নির্মম যন্ত্রণা সইতে না পেরে অবশেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন তিনি।
নিহত ফারজানা নওগাঁর মান্দা উপজেলার গণেশপুর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামের কলা ব্যবসায়ী ওমর ফারুক ওরফে মোহরের মেয়ে। তিনি মান্দা থানা আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের এইচএসসি শিক্ষার্থী ছিলেন।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সতীহাট কে.টি. উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এসএসসি পাস করার পর ফারজানা মান্দা থানা আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজে ভর্তি হন। পড়াশোনা চলাকালীন পার্শ্ববর্তী মৈনম ইউনিয়নের মৈনম মোল্লাপাড়া গ্রামের এনামুল হকের ছেলে মেহেদী হাসানের (২৬), যিনি মাছ ব্যবসায়ী, সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মেহেদী একসময় মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতেন। প্রায় আড়াই বছর আগে পরিবারের অমতে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রেমের বিয়ে হওয়ায় সে সময় কোনো যৌতুক ছাড়াই ফারজানার বাবা ওমর ফারুক সাধ্যমতো আসবাবপত্র দিয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।
বিয়ের তিন-চার মাস পর ফারজানাকে বাবার বাড়িতে রেখে ঢাকা চলে যান মেহেদী। সেখানে তিনি একটি গার্মেন্টসে চাকরি নেন। পরবর্তীতে স্ত্রীকে ঢাকার সাভারের উলাইল-গেন্দা এলাকায় নিজের কাছে নিয়ে যান।
অভিযোগ উঠেছে, ঢাকায় যাওয়ার পর মেহেদী হাসান একাধিক মেয়ের সঙ্গে পরকীয়া ও অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। স্ত্রীর অমতে অন্য মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশা করায় সংসারে তীব্র অশান্তি শুরু হয়। এর প্রতিবাদ করলেই ফারজানার ওপর নেমে আসত নির্যাতন। পরকীয়ার পাশাপাশি মেহেদী নতুন করে যৌতুক এবং ঘর সাজানোর জন্য দামি আসবাবপত্র ও একটি মোটরসাইকেলের দাবি জানান।
যৌতুক ও পরকীয়ার বিরোধে ফারজানার ওপর নেমে আসে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এমনকি নির্যাতনের কারণে ফারজানার চার মাসের গর্ভের সন্তানও নষ্ট হয়ে যায় বলে অভিযোগ স্বজনদের। গত ভাদ্র মাসে ফারজানার বাবা-মা জামাইয়ের বাড়িতে সাজ-সামগ্রী নিয়ে গেলে ফারজানার শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাদের বাড়ির ভেতর পর্যন্ত ঢুকতে দেয়নি।
নিহত ফারজানার বড় আম্মা বেদেনা বলেন, গত রোববার বিকেলে মেহেদীর বাবা ফারজানার জেঠাতো বোন, গার্মেন্টসকর্মী রেশমাকে ফোনে জানান, ফারজানাকে তালাক দেওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। যেকোনো সময় তাকে তালাক দেওয়া হবে। এরপর গত বুধবার বিকেলে ভিডিও কলে ফারজানার সঙ্গে তার স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির লোকজনের শেষ কথা হয়। মোবাইলে মানসিক নির্যাতন করায় তখনও ফারজানা কান্নাকাটি করছিলেন।
অবশেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে স্বজনরা জানতে পারেন, ঢাকার ভাড়া বাসায় ফারজানা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, একদিকে প্রেম করে বিয়ে করে বাবা-মায়ের অবাধ্য হওয়া, অন্যদিকে ঢাকায় এসে স্বামীর পরকীয়া ও ধারাবাহিক মানসিক নির্যাতন—সব মিলিয়ে চরম অভিমানে ফারজানা আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন।
ঢাকার শেরেবাংলা নগরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে গত শুক্রবার রাত ২টার দিকে ফারজানার মরদেহ গ্রামের বাড়ি শ্রীরামপুরে আনা হয়। এরপর শনিবার সকাল ১০টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে চোখের জলে তাকে দাফন করা হয়।
এলাকাবাসী ও নিহতের পরিবার এই নির্মম নির্যাতনের সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযুক্ত স্বামী মেহেদী হাসানসহ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।