গুজবের প্রভাবে ধানের দাম কমছে, হতাশ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষকরা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

সারাবাংলা

সরকার ভারত থেকে চাল আমদানি করবে, এমন গুজব রটিয়ে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘনার তীরবর্তী অন্যতম বৃহৎ ধান-চালের বাজারকে অস্থির

2026-07-07T15:52:23+00:00
2026-07-07T15:52:23+00:00
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬
   
গুজবের প্রভাবে ধানের দাম কমছে, হতাশ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষকরা
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬, ৩:৫২ পিএম   (ভিজিট : ৪৮)
সংগৃহীত ছবি
X

সংগৃহীত ছবি

সরকার ভারত থেকে চাল আমদানি করবে, এমন গুজব রটিয়ে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘনার তীরবর্তী অন্যতম বৃহৎ ধান-চালের বাজারকে অস্থির করার অভিযোগ উঠেছে মিল মালিকদের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।

 যার কারনে আশুগঞ্জ ধান-চালের হাটে এসে ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না, হাওর অঞ্চলের কৃষকসহ ব্যাপারীরা। এ অবস্থায় ধান নিয়ে হাটে এসে লোকসান গুনতে হচ্ছে ব্যাপারীদের। তাই বাধ্য হয়েই কম মূল্যে ধান বিক্রি করছেন ব্যাপারীরা। এদিকে গুজবের বিরুদ্ধে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলকে বিভ্রান্ত না হয়ে সর্তক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

জানা যায়, গত বোরো মৌসুমে সরকার ৩৬ টাকা কেজি ধরে ধান ও ১'হাজার ৪৪০ টাকা দরে প্রতি মণ ধান সংগ্রহের দাম নির্ধারন করেন। তবে উজানে পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যায় হাওড়াঞ্চলের কৃষকেরা অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

তবে উজানে যারা ধানের আবাদ করেছেন সেসব কৃষকেদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না তারা।

জেলার বিজয়নগরের কৃষক ফুল মিয়া  জানান, উজানে ধান হয়েছে, কিন্তু ধানের দাম বলে কম। ৮৫০ থেকে ১'হাজার ৫০ টাকার বেশি দামে ধান বিক্রি করা যায় না। অথচ সরকার ১'হাজার ৪৪০ টাকা ধানের মণ নির্ধারন করেছে। সরকার এই নিদিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে অ্যাপের মাধ্যমে ক্রয় করছে। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করার কথা বললেও বাস্তবে ভিন্ন। ব্যাপারীরা ধান ক্রয় করতে এসে বলে  ৯'শ টাকা মণ, চিকন ধান হলে বলে হাজার এগারোশত টাকা। অথচ এক কানি জমি (৩০শতাংশ) করা থেকে খরচ হয় ৮'হাজার থেকে ১০'হাজার টাকা। সব কিছুর দাম বেশি। বিক্রির সময় গিয়ে ধানের দাম পাই না। ব্যাপারীও নিন্ডিকেট করে ধান কিনে গোডাউন লোড করে রাখে। দাম বাড়লে বেশি মূল্যে ধান বিক্রি করে তারা লাভবান হচ্ছে।
নাসিরনগরের কৃষক আবুলাল জানান, ধার-দেনা করে জমি করেছি, ধান কাটতে গিয়া শ্রমিকের যে মূল্য এ মূল্য হিসাব করলেও স্থানীয় বাজারে ধানের দাম পাওয়া যায় না। সরকার যে মূল্যে ধান কিনছে, এ মূল্যেতো বাজারে ধানের দাম পাওয়া যায় না। সরকার তো আর সবার কাছ থেকে ধান কিনছে না। এমন মূল্য কই পামু। ব্যাপারীরা বলে মিল মালিকেরা ধান কিনে না। তারা কৃষকের কাছ থেকে কমে ধান কিনে। পরে বাজার বাড়তির সময়, তারা বিক্রি করে দামে। আর আমরা কৃষক সব সময় অবহেলিত। এ ব্যাপারে ধানের বাজারকে আগে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

এদিকে সরকার ভারত থেকে দেড় লাখ টন চাল আমদানি করবে সম্প্রতি এমন গুজব রটিয়ে দেশের পূর্বাঞ্চলের অন্যতম ধান চালের বৃহৎ হাট ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ধান চালের বাজারকে অস্থির করে তুলেছে একটি চক্র। তাদের দাবি, চালের মিল গুলোতে বিপুল পরিমাণ অবিক্রিত চাল রয়েছে। আবার চাল আমদানি হলে চালের দাম আরো কমে যাবে। এই মর্মে হাওর অঞ্চলের কৃষক ও ব্যাপারীদের কাছ থেকে ধান কিনছেন না মিল মালিকদের সিন্ডিকেটের সদস্যরা। এমন পরিস্থিতিতে হাজার-হাজার মণ ধান নিয়ে আশুগঞ্জ বাজারে এসে অনেকটাই বিপাকে পরেছে কৃষক ও ব্যাপারীরা। এই সুযোগে মধ্যস্বত্ব ভোগীরা কম মূল্যে ধান সংগ্রহ করছে।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থেকে ধান নিয়ে আস সেলিম মিয়া বলেন, নৌকার আমদানি দেখলে বাজার দর কমিয়ে ফেলে মিল মালিকদের সিন্ডিকেট। গত ৪ দিন ধরে বসে আছি। হাওর থেকে ১'হাজার ১'শ টাকা মণ ধান কিনে এনে এখন ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়ে। কারন টাকা লগ্নি এনে ব্যবসা করছি। একটা নৌকা এনে বসিয়ে রাখলে দিনে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। এখানে পাঁচ দিন বসে থাকলে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। বসে থেকে তো লাভ হয় না। তাই বাধ্য হয়ে কম দামেই বিক্রি করে দিচ্ছি।

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থেকে ধান নিয়ে হাটে আসা মিলন চন্দ্র দাস বলেন, ধান কিনে আনতেছি ১'হাজার ১৫০ টাকা মণ দরে। বাজারে ৭০০ টাকা মণ বলতেছে। গত ৩ দিন ধরে বসে আছি। ধান বিক্রি করতে পারছি না। আমাদের অনেক লোকসান হচ্ছে। সরকার ধানের দাম দিয়েছে ১'হাজার ৪৪০ টাকা। আমাদেরকে ধানের দাম দিচ্ছে মিল মালিকেরা ৭০০ টাকা। আমাদের ধান মিল মালিক পক্ষ কিনছে না। তাই বিপদে পড়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।

মিল মালিক পক্ষের হোসেন মিয়া জানান, বাজারে বিভিন্ন ধরনের ধান আছে। সে সকল ধান আমরা কিনে চাউল করে আমরা বিক্রি করতে পারছি না। এদিকে শুধু ধান কিনে জমাচ্ছি। মিল সব বন্ধ হয়ে আছে। বেঁচা-বিক্রি নাই। শুনতেছি সরকার এলসিতে চাল আমদানি করবে। এই আতংকে আমাদের মিল গুলোতে বেঁচা-বিক্রি এক দম নাই। কারণ সব মিলে অবিক্রিত চালে ভরা।

মিল মালিক পক্ষের জয়নাল আবেদিন জানান, মালিকেরা ধান থেকে চাল তৈরী করে লোকশান হচ্ছে। চাউল বিক্রি করতে পারছে না মিল বন্ধ। আগের চাউল রাখার জায়গা নাই। এর মধ্যে সরকার বলছে, এলসি ঢুকাবে। তাই কোনো খরিদ্দাররা চাউল কিনতেছে না। সবাই ভাবতেছে চাউলের দাম আরো কমবে। তাই সবাই আতংকের মধ্যে রয়েছে। আর যারা ধান ক্রয় করবে, তারাও আতংকের মধ্যে পরে রয়েছে। যার কারণে দাম দিয়ে ধান কিনতে আগ্রহী না।

এ দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের  সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) নূর আলী বলেন, আসলে একটা গুজব ছড়িয়েছে, সরকার এলসির মাধ্যমে ভারত থেকে চাল আমদানি করছে। আসলে এটা একটা নিছক গুজব। আমাদের খাদ্য মন্ত্রনালয় থেকে গত ২৩জুন একটা পরিপত্র জারি করা হয়েছে। একটা প্রেস রিলিজ দেওয়া হয়েছে, আসলে এটা গুজব। সরকারের এরকম কোনে পরিকল্পনা নাই বলেই আমরা জানি। কৃষকদের কাছ থেকে সরকার ন্যায্যমূল্যে ৩৬ টাকা কেজি দরে ধান সংগ্রহের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি মিল থেকেও সরকার চাল ক্রয় করছে। এই চাল ক্রয়ের মাধ্যমে বাজারে একটা প্রভাব পড়ছে। যাতে বাজারটা উর্ধ্বগতি হয়। কৃষকেরা যেনো ন্যায্য মূল পায়। কেউ কেউ হয়তো অনলাইন মিডিয়ায় একটা গুজব ছড়াচ্ছে। এ ক্ষেএে আমরা আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও মিডিয়াতে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দিয়েছি। সংশ্লিষ্ট কৃষি অফিসকে আমরা জানাচ্ছি ,কৃষকরাও এক্ষেত্রে গুজবে আর কান দিচ্ছেন না। বাজারে আমাদের পক্ষ থেকে মনিটরিং চলছে।

এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া খাদ্য নিয়ন্ত্রণক কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গুজবের ব্যাপারে সরকার সজাগ রয়েছেন। এ বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চাল আমদানি বিষয়টি যে গুজব এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক করা হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি বিপনন কর্মকর্তা আবু বকর জানান, কৃষকেরা যেন ন্যায্য মূল্য পায় সে ব্যাপারে তাদেরকে পরামর্শের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেয়া হবে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চল থেকে ৪'লাখ ৯৭'হাজার ৭'শ ৯০ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। এর মধ্যে আগামী ৩১ আগষ্টের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চল থেকে সরকার  ৪৮ টাকা কেজি দরে ৪'হাজার ৯'শ ৯৩ মেট্রিক টন আতপ চাল এবং ৪৯'টাকা কেজি দরে ৬৯'হাজার ২৭২ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ করবে। ৩৬ টাকা দরে ১১'হাজার ৫৫ মেট্রিক টন ধান ক্রয় করবে।





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy