
X
ছবি: প্রতিনিধি
মাদারীপুরে আলোচিত ডিস ব্যবসায়ী আলমগীর হাওলাদার হত্যা মামলার প্রধান আসামি বিএনপি নেতা লাভলু হাওলাদার প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাঁকে গ্রেপ্তার করছে না পুলিশ। সম্প্রতি আসামি লাভলু হাওলাদারকে একটি মাদকবিরোধী সমাবেশে সংসদ সদস্য ও ওসির সঙ্গে একই মঞ্চে অংশ নিতে দেখা গেছে।
মামলার বাদীর অভিযোগ, আসামি লাভলু বিএনপির নেতা হওয়ায় তাঁকে এমপি আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। এ কারণে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করছে না।
হত্যা মামলার প্রধান আসামি লাভলু হাওলাদার (৫৩) জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি মাদারীপুর পৌরসভার মেয়র পদপ্রার্থীও। গত ১১ মার্চ লাভলুর বিরুদ্ধে আলমগীর হাওলাদারকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়। এরপর থেকে তিনি পলাতক ছিলেন। তবে গত দুই মাস ধরে তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক অনুষ্ঠানেও তিনি অংশ নিচ্ছেন।
গত ৩ জুলাই রাতে মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নে আয়োজিত এক মাদকবিরোধী সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাহান্দার আলী মিয়া। তাঁর সঙ্গে বিশেষ অতিথি হিসেবে বিএনপির নেতা লাভলু হাওলাদার ছাড়াও সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে আসামিরা প্রকাশ্যে এসে প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি হত্যার হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন আলমগীরের স্ত্রী ও মামলার বাদী রেখা বেগম। তিনি বলেন, ‘আসামিরা মামলা তুলে নিতে চাপ দিচ্ছে। এলাকায় থাকতে পারছি না। আমাদের বাড়িঘরও লুটপাট হয়ে গেছে। এলাকায় গেলে আমার একমাত্র ছেলেকে খুন করে ফেলার হুমকিও দিয়েছে। এসব ওই লাভলুই করাচ্ছে। আগে পলাতক থাকলেও এখন প্রকাশ্যে সব করছে। পুলিশও তাকে ভয় পায়, কিছু বলে না।’
নিহত আলমগীর হাওলাদারের ছেলে আল-আমিন হাওলাদার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার বাবার খুনিদের বিচার চাইতে গিয়ে আমরা এখন ঘরবাড়িছাড়া। জামিন ছাড়া কীভাবে একটি হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়? হাইকোর্টে তিনি জামিন চাইলেও তাঁকে জামিন দেওয়া হয়নি। পুলিশকে আমরা আসামিকে ধরার বিষয়ে তথ্য দিলেও তারা কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না। মামলার প্রধান আসামি লাভলু হাওলাদারকে স্বয়ং এমপি প্রশ্রয় দিচ্ছেন। এ কারণে পুলিশও তাকে গ্রেপ্তার করছে না। আমি শুধু আমার বাবার হত্যাকারীদের বিচার চাই।’
এ সম্পর্কে সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি জানতাম তিনি (লাভলু হাওলাদার) জামিনে আছেন এবং আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। আমি কোনো অন্যায়কারী বা অপরাধীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিই না। তিনি যে জামিনে নেই, সেটি আমার জানা ছিল না।’
এ বিষয়ে লাভলু হাওলাদার মুঠোফোনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনি আমাকে চিনেন না? চিনেন তো অবশ্যই। আপনি সামনাসামনি আসেন। আমি অফিসে আছি, আপনি আসেন।’
মাদারীপুর সদর মডেল থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি কোনো লাভলু-ঠাবলুকে চিনি না। তবে লাভলুর নাম শুনেছি। ব্যক্তি হিসেবে আমি তাকে চিনি না। এমপি সাহেবের সঙ্গে মঞ্চে কারা ছিলেন, সেটাও আমার মনে নেই। লাভলুকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি তদন্তকারী কর্মকর্তা বলতে পারবেন।’
এ বিষয়ে সদর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. মহসীন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আলমগীর হত্যা মামলার প্রধান আসামি লাভলু হাওলাদার হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন বলে শুনেছি। তবে তাঁর কোনো জামিনের কাগজপত্র আমরা পাইনি। এ মামলায় ৬৮ জন আগাম জামিন নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে লাভলু হাওলাদারের নাম নেই।’
আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাঁর (লাভলু হাওলাদার) বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা চলমান রয়েছে। তাঁকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তিনি আমাদের কাছে পলাতক। মামলার বাদী বা তাঁর পরিবারকে হুমকি দেওয়ার বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে তাঁদের নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করা হবে।’
গত ১০ মার্চ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মাদারীপুর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন মাদারীপুর এলাকায় ঘরে ঢুকে আলমগীর হাওলাদার (৫০) নামের এক ব্যবসায়ীকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক লাভলু হাওলাদারকে প্রধান আসামি করে ৮৭ জনকে এজাহারভুক্ত করা হয়। ঘটনার পর নতুন মাদারীপুর এলাকায় অন্তত ১০ বার উভয় পক্ষের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এছাড়া আগুন দিয়ে শতাধিক বসতঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়।