
X
সংগৃহীত ছবি
প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা পাহাড়ধসে কক্সবাজারে লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। গত সপ্তাহজুড়ে টানা বর্ষণে পাহাড়ধসে কক্সবাজারে ২১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা শিশু ও নারীর সংখ্যা ১৫ জন।
সর্বশেষ পাহাড়ধসে চকরিয়ার বরইতলিতে ঘুমন্ত দুই ভাই-বোনের মৃত্যু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত পাহাড়কোলে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসের কারণেই পাহাড়ধসে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। বিগত ১৯ বছরে কক্সবাজার পাহাড় ধসে মারা গেছে অন্তত ৩৮০ জন।
তথ্য মতে, কক্সবাজারের ১০ উপজেলার ৯টিতেই পাহাড়ধসে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি নিয়ে দিনাতিপাত করছে প্রায় ৫ লাখ মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়েছে টেকনাফ, উখিয়া, কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়ায়।
অভিযোগ রয়েছে, টানা ভারী বর্ষণ হলেই শুধু ঝুঁকিতে থাকা এই জনগোষ্ঠীকে নিয়ে ভাবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। শুষ্ক মৌসুমে তাদের জীবন-ঝুঁকির কথা মনেই থাকে না প্রশাসনের, যার কারণে প্রতি বর্ষায় লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। অন্যদিকে পাহাড় কেটে বসবাসের কারণে পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। তবে স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন বলছেন, পাহাড়ধসে মৃত্যু ঠেকাতে আইনের প্রয়োগের চেয়ে সচেতনতা বেশি প্রয়োজন।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া-টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৩৩৪ জন রোহিঙ্গা অর্থাৎ ৮৪ হাজার ৩৮১টি পরিবার বন্যা ও পাহাড়ধসের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে। এবারের টানাবৃষ্টিতে একরাতে ৮ জনসহ ১৫ জনের প্রাণহানির পর আশ্রয়শিবিরে আতঙ্ক বেড়েছে।
উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের প্রধান মাঝি দিল মোহাম্মদ জানান, বেশি বৃষ্টি হলে পাহাড়ের মানুষগুলো ভয়ে থাকে কখন পাহাড় ভেঙে পড়ে। আর নিচে থাকা মানুষের ভয় কখন পানি উঠে আসে; শান্তি যেন কোথাও নেই। ক্যাম্প-৫ তুলনামূলক সমতল এলাকায় হলেও টানা বৃষ্টিতে সেখানে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, ঘরের ভেতরে পানি ঢুকেছে এবং অনেক পরিবার উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। ক্যাম্পের তিন মাঝি মনা মিয়া, শবির আহামদ ও দই মাঝি জানান, শুধু এই ক্যাম্পেই অন্তত ২০০টি আশ্রয়ঘর প্লাবিত হয়েছে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এ ব্লকের এ-৩ সাব-ব্লকে।
রোহিঙ্গা দিল মোহাম্মদ, শবির আহমদ, মনা মাঝিদের মতোই পাহাড় ধসের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজার দক্ষিণ হাজীপাড়ার বয়োবৃদ্ধা ছকিনা বিবি, জুলেখা বেগম এবং দরিয়ানগরের নুর আয়েশা বেগম। হতদরিদ্র এই নারীরা জানান, পাহাড়ের ঢালুতে ছোট ঘর করে কোনো রকমে জীবনযাপন করছেন। বর্ষাকাল এলে আতঙ্কে রাতে ঘুমাতে পারেন না, তবুও বাঁচার জন্য ঘর লাগে। চকরিয়ার খুটাখালীর জাতীয় উদ্যানে ঘর করে বসবাসরত জলবায়ু উদ্বাস্তু মকতুল হোসেন জানান, আগে কুতুবদিয়ায় সবকিছু থাকলেও ৯১-এর মহা ঘূর্ণিঝড়ে সব হারিয়ে এখানে ঢালুতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছেন। ঢালু হওয়ায় পাহাড়ধসের শঙ্কা না থাকলেও শতবর্ষী গর্জন মাদার ট্রি ঘরের ওপর ভেঙে পড়ার আতঙ্কে আছেন তিনি।
কক্সবাজার সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আকতার জানান, সদর উপজেলার ঝিলংজা ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের ঢালুতে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মানুষের ঝুঁকিমুক্ত বসবাস নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
কক্সবাজার অঞ্চলের পাহাড়ধস নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারে ১২৪টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ফলে এটি এখন দেশের অন্যতম পাহাড়ধসপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অন্যদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নিগার সুলতানার ২০২২ সালের গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১১টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে, যাতে গড়ে ৩৪ জন নিহত ও ৫৪ জন আহত হন এবং জুন থেকে আগস্ট মাসকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুম হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এই গবেষণার তথ্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে টানা আট দিনের ভারী বর্ষণে ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ অন্তত ২১ জন পাহাড়ধসে নিহত হয়েছে এবং আশ্রয়শিবিরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১২০টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান জানান, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোর মধ্যে ক্যাম্প-৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫ সবচেয়ে বেশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্ষা শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। তবে গত দুই বছরে নতুন করে আশ্রয় নেওয়া প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অনেকেই বাধ্য হয়ে পাহাড়ের ঢালসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিজেদের মতো করে আশ্রয় নির্মাণ করেছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবেও বসতি গড়ে উঠেছে। ক্যাম্প-১১-তে যে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, সেটিও এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নির্মিত আশ্রয়কে কেন্দ্র করে। আরআরআরসি বলেন, সবচেয়ে বড় সংকট হলো পর্যাপ্ত নিরাপদ জায়গার অভাব। বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং নিরাপদ জমির সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক পরিবার এখনও পাহাড়ধসের ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পরিবেশবাদী সংগঠনের তথ্য বলছে, গত ১৯ বছরে পাহাড়ধসে কক্সবাজারের ৩৩৩ জন স্থানীয় মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পাহাড়ধসে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৪৬ জনের। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পাহাড়ধস হয় ২০১০ সালের ১৫ জুন; ওই দিন রামুর হিমছড়ি এলাকার ১৭ ইসিবি সেনাক্যাম্পের ছয় সেনাসদস্যসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে ৬২ জন প্রাণ হারান। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাহাড়ধসে ২০০৮ সালে ১৩ জন, ২০০৯ সালে পাঁচ, ২০১২ সালে ২৯, ২০১৫ সালে পাঁচ, ২০১৬ সালে ১৭, ২০১৭ সালে ২৬, ২০১৮ সালে ২৮, ২০১৯ সালে ২২, ২০২০ সালে ২৯, ২০২২ সালে ২৫, ২০২৩ সালে ছয়, ২০২৪ সালে ১০ এবং চলতি বছরে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ২১ জন।
ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) প্রধান নির্বাহী ইব্রাহীম খলিল মামুন বলেন, ভারী বর্ষণ হলেই সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তৎপর হয়ে ওঠে, পরে আর খবর থাকে না। একদিকে পাহাড়ধসে মৃত্যু হচ্ছে, অন্যদিকে পাহাড় কেটে পরিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্রতিবছর বর্ষার আগে প্রশাসন ও বন বিভাগ যৌথভাবে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরিয়ে নেয়। এতে কিছুদিন সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও লোকজন ফের সেই স্থানে বসবাস শুরু করে। এতে পাহাড়ের ক্ষতি এবং প্রাণহানি ঘটছে। প্রায় চার লাখ ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীর ব্যাপারে স্থায়ী সমাধান বের করতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে মামলা হয়েছে ৩২০টি, যার মধ্যে শুধু পাহাড় কাটার অভিযোগে মামলা হয়েছে ২৪৫টি। প্রতিদিন কোনো না কোনো এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ইমরান হোসাইন সজীব বলেন, পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রশাসন কাজ করছে। প্রতিবছর বর্ষা এলে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে আবার তারা বসবাস শুরু করে। এ বিষয়ে স্থায়ী সমাধানে আইনের প্রয়োগের চেয়ে সচেতনতাই বেশি প্রয়োজন।