
X
বানের পানিতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার বন্যাকবলিত একটি বাড়িতে পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন একই পরিবারের ১১ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। চারদিকে বানের পানিতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তাদের কাছে এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছেনি। ফলে অনিশ্চয়তা ও চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটছে তাদের।
রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের হাওরপারের দক্ষিণ ইসলামপুর গ্রামের কামাল মুন্সির বাড়িতে বসবাস করেন এই ১১ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তারা হলেন—ফখরুল মিয়া,কামাল মুন্সি, সোহান মিয়া, সুফি বেগম, শারমিন বেগম,জগলু মিয়া,ফাইজা বেগম,সাজক মিয়া,আনিকা,লাউল মিয়া ও আকবর আলী।
টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা লাগাটা নদীর ঢলে সৃষ্ট বন্যায় বাড়িটির চারপাশ পানিতে তলিয়ে গেছে। চলাচলের সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেউ তাদের বাড়িতে যেতে পারছেন না। আবার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় পরিবারের সদস্যরাও বাইরে বের হয়ে সাহায্য চাইতে পারছেন না। নিরাপদে অন্যত্র সরে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় তারা ঘরবন্দি অবস্থায় দিন পার করছেন। খাদ্য,বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটও দিন দিন তীব্র হচ্ছে।
সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে কথা হলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুফি বেগম বলেন,আমি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। আগে মানুষের বাড়িতে ছোটখাটো কাজ করে কিছু সহযোগিতা পেতাম। কিন্তু বন্যার পর কোথাও যেতে পারছি না, আবার কেউও আমাদের কাছে আসতে পারছে না। একবেলা খেলে আরেকবেলা না খেয়ে থাকতে হচ্ছে।
পরিবারের প্রবীণ সদস্য কবিতুন বেগম বলেন,এই বাড়িতে অনেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছেন। তাদের জীবনযাপন খুবই কষ্টের। কেউ যদি তাদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে অনেক উপকার হবে।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কামাল মুন্সি বলেন, আমরা জন্ম থেকেই অন্ধ। চিকিৎসকরা বলেছেন আমাদের দৃষ্টি আর ফিরে আসবে না। টাকার অভাবে এখন চিকিৎসাও করাতে পারি না।
স্থানীয় সমাজসেবক সুমন আহমদ বলেন, বন্যার কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সেখানে সহজে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ১১ জনের মধ্যে ৮ জন প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। তবে বাড়ির চারদিকে পানি থাকায় পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা এখনো পৌঁছানো যায়নি।
তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই সময়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় কোনো সামাজিক সংগঠনও সেখানে পৌঁছাতে পারছে না।
রাজনগর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আজাদুর রহমান বলেন, ১১ জনের মধ্যে ৮ জন বর্তমানে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। বাকি তিনজন আবেদন করলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সহযোগিতার চেষ্টা করছি। সরকারি কোনো বিশেষ বরাদ্দ এলে তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়া হবে।
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদার বলেন,বিষয়টি জানার পর আমরা খোঁজ নিয়েছি এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা পাঠানো হয়েছে। ভবিষ্যতেও তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।
এদিকে, সোমবার বিকেলে উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের পক্ষ থেকে পরিবারের জন্য নগদ আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি,দীর্ঘমেয়াদে এই অসহায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পরিবারের জন্য খাদ্য,চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।