
X
ছবি: প্রতিনিধি
সারাদেশে বন্যা পরিস্থিতি ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি হওয়ায় নদীতে প্রবল স্রোতের কারণে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে পদ্মাপাড়ের মানুষের। পদ্মার প্রবল স্রোতের কারণে নবনির্মিত তীররক্ষা বাঁধের বেশ কিছু জায়গাজুড়ে বড় ধরনের ধস দেখা দিয়েছে।
লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া এলাকায় মাত্র দেড় মাস আগে নির্মিত স্থায়ী নদীতীর রক্ষা বাঁধে আকস্মিক ধস নেমেছে। সিসি ব্লক ধসে নদীগর্ভে বিলীন হতে থাকায় তীব্র ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন নদীপারের শত শত পরিবার। দীর্ঘদিনের স্থায়ী সমাধানের আশা জাগিয়েও বাঁধের এমন ভঙ্গুর দশা স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
দীর্ঘদিনের ভাঙন আতঙ্ক কাটাতে পদ্মার তীরে নির্মাণ করা হয়েছিল স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ। বাঁধ নির্মাণের পর স্বপ্ন দেখেছিলেন নদীপাড়ের মানুষ— এবার হয়তো আর হারাতে হবে না বসতভিটা, রক্ষা পাবে শেষ সম্বল। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে যেতে শুরু করেছে মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই।
৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজের মান নিয়েও এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
২০২১ সালে শুরু হয়ে ২০২৫ সালে কাজের মেয়াদ শেষ হলেও পুনরায় এর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
গাঁওদিয়া এলাকায় পদ্মা নদীর তীররক্ষা বাঁধের সিসি ব্লক একের পর এক সরে গিয়ে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় নতুন করে ভাঙন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এলাকাজুড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশের আশপাশে বসবাসকারী পরিবারগুলো রাত কাটাচ্ছেন উৎকণ্ঠায়। অনেকেই নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ঘরের মালামাল সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন।
স্থানীয়রা আক্ষেপ করে জানান, যে বাঁধকে ‘স্থায়ী সমাধান’ হিসেবে দেখানো হয়েছিল, সেটি নির্মাণের এত অল্প সময়ের মধ্যেই কেন এমন দুর্বল হয়ে পড়ল, তা নিয়ে এখন জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত রোববার বিকেলে গাঁওদিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গাঁওদিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে নদীতীর রক্ষা বাঁধে হঠাৎ ধস দেখা দেয়। প্রথমে কয়েকটি সিসি ব্লক সরে গেলেও পরে দ্রুত বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। কোনো ধরনের বড় শব্দ বা পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই বাঁধের ব্লকগুলো পদ্মার স্রোতে তলিয়ে যেতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী পরিবারগুলো ভয়ে ঘর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে থাকেন।
দেড় মাসেই ভাঙল ‘স্থায়ী’ বাঁধ, পদ্মাপাড়ে ফের আতঙ্ক
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাগর বলেন, “বিকেলে হঠাৎ দেখি বাঁধের ব্লক ভেঙে নদীতে পড়ে যাচ্ছে। রাতে আমরা আতঙ্কে ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়েছি। এখন বুঝতে পারছি না, কোথায় থাকব।” পদ্মার ভাঙনে লৌহজংয়ের এই অঞ্চলের মানুষ বহুবার সর্বস্ব হারিয়েছেন। নদীর আগ্রাসনে বসতভিটা হারিয়ে নতুন জায়গায় আশ্রয় নেওয়া অনেক পরিবারের কাছে এই বাঁধ ছিল নিরাপত্তার শেষ ভরসা।
বাঁধের পাশে বসবাসকারী ভুক্তভোগীরা জানান, “আমরা ৩০ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে সব হারিয়েছি। বাঁধ হওয়ার পর মনে হয়েছিল এবার শান্তিতে একটু ঘুমাতে পারব। কিন্তু দেড় মাসের মধ্যেই যদি বাঁধের এই অবস্থা হয়, তাহলে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?”
ভুক্তভোগীরা আরও বলেন, “বাঁধ দেখে মনে হয়েছিল আমাদের ভয় কেটে গেছে। এখন আবার মনে হচ্ছে সব হারানোর সময় এসেছে। অনেক আগেই জায়গা-জমি নদীতে চলে গেছে। এখানে এসে ভেবেছিলাম অন্তত মাথা গোঁজার জায়গাটা থাকবে। এখন সেই জায়গাটাও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।”
স্থায়ী বাঁধে এত দ্রুত ধস নামায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে কোনো ধরনের দুর্বলতা বা ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তারা বলছেন, বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই যদি বাঁধের এই অবস্থা হয়, তাহলে সামনে নদীর পানি ও স্রোত আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু জরুরি ভিত্তিতে ব্লক বসালেই হবে না; বাঁধের নকশা, নির্মাণকাজের মান, ব্যবহৃত উপকরণের গুণগত মান এবং অন্যান্য বিষয়ও যাচাই করতে হবে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে গাঁওদিয়া বাজারসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এদিকে ভাঙন পরিস্থিতি দেখতে গত সোমবার (১৩ জুলাই) সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ববি মিতু। তিনি বলেন, “সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। রাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা উপস্থিত হয়ে ফাটলস্থানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন।”
মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, “এখন ভয়ের কোনো কারণ নেই। খবর পাওয়ার পর থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে রয়েছেন।”
উল্লেখ্য, পদ্মা বহুমুখী সেতুর ভাটিতে মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলাধীন বিভিন্ন স্থানে পদ্মা নদীর বাম তীর সংরক্ষণ প্রকল্পটির মেয়াদ অক্টোবর ২০২১ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত থাকলেও পরবর্তীতে মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার নদীতীরবর্তী এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণকাজ এখনও ধীরগতিতে চলছে।