পিরোজপুরে ঝর্ণা হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি খালাস

নিজস্ব প্রতিবেদক

সারাবাংলা

পিরোজপুরের নেছারাবাদে কলেজছাত্রী ঝর্ণা রাণী দেউরীকে অপহরণ ও হত্যার মামলায় জজ আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি লিটন মণ্ডলকে খালাস

2026-07-15T20:39:25+00:00
2026-07-15T20:39:25+00:00
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬
   
পিরোজপুরে ঝর্ণা হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি খালাস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৮:৩৯ পিএম   (ভিজিট : ৩৩)
প্রতীকী ছবি
X

প্রতীকী ছবি


পিরোজপুরের নেছারাবাদে কলেজছাত্রী ঝর্ণা রাণী দেউরীকে অপহরণ ও হত্যার মামলায় জজ আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি লিটন মণ্ডলকে খালাস দিয়েছে হাই কোর্ট। পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তদন্তের ‘দুর্বলতা’ বিবেচনায় নিয়ে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাই কোর্ট বেঞ্চ বুধবার এ রায় দেয়। 

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, প্রসিকিউশন আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থ’ হয়েছে।


রায়ের পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির বলেন, “সুরতহাল ও ময়নাতদন্তে শ্বাসরোধে মৃত্যুর কথা বলা হলেও লাশ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের আইনি দুর্বলতা ছিল। ভিকটিমের বাবা সরাসরি মৃতদেহ না দেখেই থানায় কেবল কাপড়চোপড় এবং পুলিশের দেখানো একটি ছবির ওপর ভিত্তি করে মেয়েকে শনাক্ত করেন। “শনাক্তকরণের জন্য ব্যবহৃত ওই ছবিটি নিম্ন আদালতের নথিতে (এলসিআর) সংযুক্ত ছিল না। অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত আসামিকে খালাস দিয়েছে।”

আসামিপক্ষের আইনজীবী বুলবুল রাবেয়া বানু গণমাধ্যমকে জানান, “শুরুতে মামলাটা করা হয়েছিল অপহরণের অভিযোগে, পরে এর সঙ্গে হত্যা যুক্ত করা হয়। কিন্তু নথিপত্র ও সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুযায়ী ঘটনাটি কোনোভাবেই অপহরণের আইনি সংজ্ঞায় পড়ে না।” আইনের ব্যাখ্যায় এই আইনজীবী বলেন, “দণ্ডবিধির ৩৬২ ধারা অনুযায়ী বলপ্রয়োগ, প্রলুব্ধ করা, ফুসলিয়ে নেওয়া, ভুল বোঝানো বা ভীতি প্রদর্শন করে কোনো স্থান থেকে কোনো ব্যক্তিকে অন্যত্র যেতে বাধ্য করলে তা অপহরণ হবে। কিন্তু এই মামলায় প্রসিকিউশন এর কোনোটিই প্রমাণ করতে পারেনি।”


একমাত্র চাক্ষুষ সাক্ষীর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাবেয়া বানু বলেন, “ঘটনা ১৪ তারিখের, কিন্তু একজন সাক্ষী ১৭ তারিখ মৃতদেহ পাওয়ার পর বলছেন যে, তিনি দুজনকে একসঙ্গে যেতে দেখেছেন। কাউকে জোর করে টেনে নিয়ে গেলে সে নিশ্চয় চিৎকার করত, পাড়া-প্রতিবেশী বা আত্মীয়-স্বজন কেউ না কেউ তা দেখত।” সাক্ষীর নীরবতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ১৪ তারিখে কিছুই জানাননি। ১৬ তারিখে অজ্ঞাত মৃতদেহ দাফন করার পর ১৭ তারিখে এসে তিনি এসব কথা বলেছেন।” লাশ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার ত্রুটি ও ডিএনএ পরীক্ষা না হওয়ার বিষয়টি শুনানিতে তুলে ধরে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, “যেহেতু আমার মক্কেল অপহরণই করেনি, তাহলে খুন কেন করব? এখানে সবচেয়ে বড় আইনি দুর্বলতা হল মৃতদেহ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া। লাশের কোনো ডিএনএ টেস্ট করা হয়নি, শুধুমাত্র জামাকাপড় দেখে ভিকটিমের বাবা লাশটি শনাক্ত করেছেন। সেখানে অন্য কোনো ব্যক্তি সেটি শনাক্ত করেননি।”


এ আইনজীবী আরও বলেন, “এমনও তো হতে পারে উদ্ধার হওয়া লাশটি ওই মেয়ের নয়। ছেলেটিও যেহেতু ধরা পড়েনি, তাই তারা অন্য কোথাও হয়তো সুখে-শান্তিতে বসবাস করছে এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। অপরাধমূলক ঘটনায় এমনও দেখা যায় যে, নিজের পোশাক অন্য কাউকে পরিয়ে দিয়ে নিজে অন্যত্র চলে গেছে।” রায়ের পর্যবেক্ষণের বিষয়ে আইনজীবী রাবেয়া বানু বলেন, “মামলায় কোনো স্বাধীন চাক্ষুষ সাক্ষী ছিলেন না। যিনি চাক্ষুষ সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি ভিকটিমের আত্মীয়। তাদের বয়ান থেকেই জানা যায় যে, আসামি ও ভিকটিমের মধ্যে পূর্ব থেকেই প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পারিপার্শ্বিক অবস্থা নির্দেশ করে যে, ভিকটিম স্বেচ্ছায় আসামির সাথে ট্রলারে উঠেছিলেন, যা অপহরণের দাবিকে নাকচ করে দেয়। 

“আদালত মনে করে, ‘লাস্ট সিন থিওরি’ বা আসামির সাথে ভিকটিমকে সর্বশেষ দেখা যাওয়ার সূত্র ধরে হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা (চেইন অব ইভেন্টস) প্রমাণ করা যায়নি। ফলে আসামি শুরু থেকে পলাতক থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র একজন আত্মীয়ের সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া বিচারিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিরাপদ নয় বলে আদালত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” ২০১৯ সালের ২৭ জুন পিরোজপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. মিজানুর রহমান এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে পলাতক আসামি লিটন মণ্ডলকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। অপরাধে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় রতন দেউরী, রনজিৎ হাওলাদার এবং বিপুল শাখারী নামের অপর তিন আসামিকে খালাস দেয় বিচারিক আদালত। আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মোট ১২ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছিল।

মামলার নথিতে বলা হয়, ভিকটিম ঝর্ণা রাণী দেউরী রামচন্দ্রপুর শাহ মাহামুদিয়া কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী ছিলেন। ২০০৯ সালের ২৪ মে তার বাবা সুভাষ চন্দ্র দেউরী নেছারাবাদ থানায় মামলাটি করেন। এজাহারে বলা হয়, প্রতিবেশী লিটন মণ্ডল ঝর্ণাকে উত্ত্যক্ত করত এবং বিয়ের প্রস্তাব দিলে পরিবার তা প্রত্যাখ্যান করে। ২০০৯ সালের ১৪ মে বাগেরহাটের কচুয়া থানার আন্দার মানিক গ্রামে বড় বোনের বাড়ি থেকে ফেরার পথে ঝর্ণা নিখোঁজ হন। ওইদিনই স্বরূপকাঠী কৌরিখাড়া খেয়ার ট্রলারে লিটন ও তার সহযোগীদের সাথে ঝর্ণাকে দেখতে পান সুমন দেউরী নামের এক সাক্ষী। পরে ১৭ মে পত্রিকায় বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীতে অজ্ঞাত তরুণীর লাশ উদ্ধারের খবর দেখে ভিকটিমের বাবা থানায় গিয়ে পরিধেয় বস্ত্র দেখে তা ঝর্ণার লাশ বলে শনাক্ত করেন।






Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy