ভালুকার এমপি ফখর উদ্দিন বাচ্চুকে শো-কজ, নেপথ্যে কি!

আবু সালেহ মো. মূসা

সারাবাংলা

দলীয় শৃঙ্খলা বিরোধী বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, শিল্পাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার এবং অনৈতিক অপতৎপরতায় লিপ্ত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনের

2026-07-19T17:31:25+00:00
2026-07-21T18:10:13+00:00
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬
   
ভালুকার এমপি ফখর উদ্দিন বাচ্চুকে শো-কজ, নেপথ্যে কি!
আবু সালেহ মো. মূসা
প্রকাশ: রোববার, ১৯ জুলাই, ২০২৬, ৫:৩১ পিএম  আপডেট: ২১.০৭.২০২৬ ৬:১০ পিএম  (ভিজিট : ৬৮)
ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু
X

ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু

দলীয় শৃঙ্খলা বিরোধী বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, শিল্পাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার এবং অনৈতিক অপতৎপরতায় লিপ্ত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনের এমপি ও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে বিএনপি। 

শনিবার (১৮ জুলাই) বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এই নোটিশ দেওয়া হয়। বর্তমান সংসদ সদস্যকে কেন্দ্র থেকে শো-কজ করার এই ঘটনায় গোটা ভালুকা উপজেলাসহ ময়মনসিংহ জুড়ে রাজনৈতিক চাঞ্চল্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

চিঠিতে সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ লোকজনের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে শিল্প এলাকায় নানা ধরনের অনৈতিক অপতৎপরতায় লিপ্ত থাকার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। চিঠিতে কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, এই ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে কেন চূড়ান্ত সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তার যথাযথ কারণ দর্শিয়ে ৪৮  ঘণ্টার মধ্যে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একটি লিখিত জবাব সশরীরে জমা দিতে হবে।

স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই শিল্পাঞ্চল ভালুকায় ঝুট ব্যবসা ও মিল ফ্যাক্টরির নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে এক চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। ঝুট ব্যবসার একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখতে বাচ্চু সমর্থিত পোষ্য নেতাকর্মীদের দ্বারা একাধিক হামলা, পাল্টা-হামলা ও প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের মতো সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এতে সাধারণ ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

সবশেষ খবর অনুযায়ী, হবিরবাড়ী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি বৃহৎ কারখানার ঝুট বের করতে বাধা দেওয়ার ঘটনায় প্রতিনিয়ত উত্তেজনা চলছে। অভিযোগ উঠেছে, এমপি বাচ্চু নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর অনুসারীরা উপজেলার বিভিন্ন মিল-ফ্যাক্টরি থেকে বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা ও বিএনপির বিদ্রোহী হিসেবে ভালুকা থেকে জাতিয় নির্বাচনে অংশ নেয়া মুহাম্মদ মোর্শেদ আলমের গ্রুপের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অধিকাংশ মিলের ঝুট ব্যবসা জোরপূর্বক নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। এমনকি যেসব মিল ফ্যাক্টরি এখনও দখলে নিতে পারেনি সেগুলো যেকোনো মূল্যে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য বাচ্চুর অস্ত্রধারী অনুসারীরা সংঘবদ্ধভাবে মাঠে নেমেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, দীর্ঘ ২২ বছর ধরে জামিরদিয়ায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এসকিউ গ্রুপের কালার মাস্টার কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঝুট ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ভালুকা উপজেলা বিএনপি'র সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম। কিন্তু বাচ্চু এমপি হওয়ার পর থেকেই মোর্শেদ আলমের এই দীর্ঘদিনের ব্যবসা ছিনিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে এমপির লোকজন। চলতি বছরের ১৬ মার্চ মোর্শেদ আলমের এইচআরকেএম এন্টারপ্রাইজ ওই মিল থেকে ঝুটের মালামাল বের করতে গেলে এমপি বাচ্চু গ্রুপের খোকা মিয়ার নেতৃত্বে ৫০-৬০ জনের একটি সশস্ত্র দল তাদের উপর হামলা করে।

এর পরপরই এমপির প্রভাব খাটিয়ে মোর্শেদ আলম ও তাঁর অনুসারী নেতাকর্মীদের দমনে দুটি মামলা দায়ের করানো হয়। গত ১৬ মার্চ ইব্রাহিম খলিল বাদী হয়ে মোর্শেদ আলমসহ ৫০ জন বিএনপি নেতাকর্মীকে আসামি করে ভালুকা মডেল থানায় প্রথম মামলাটি দায়ের করেন । এর ঠিক এক মাস পর গত ১৬ এপ্রিল খোকা মিয়া নিজে বাদী হয়ে মোর্শেদ আলম ও খোকার ছেলে রানাসহ ৩৭ জনকে আসামি করে ভালুকা মডেল থানায় দ্বিতীয় আরেকটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেন । ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর মোর্শেদ আলমের বিরুদ্ধে এটি দ্বিতীয় মামলা। এই মামলার ভিত্তিতে পুলিশ মোর্শেদ আলমের পক্ষের শরিফ হাসান ও মাহবুব মিয়া নামের দুই কর্মীকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায়।

ভালুকার বিভিন্ন শিল্প কারখানার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিএনপির কতিপয় নেতার এই প্রকাশ্য আধিপত্যের লড়াইয়ে শিল্পপতি ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে এলাকার হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক শঙ্কা প্রকাশ করে জানান, সংসদ সদস্যের নাম ভাঙিয়ে একদল দুর্বৃত্ত বিভিন্ন কারখানার মালিকদের তাদের নামে ঝুটের ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত ভয়ভীতি দেখাচ্ছে ও চাপ প্রয়োগ করছে। তাদের কথা মতো কাজ না হলে কারখানার গেটে ঝুট ভর্তি ট্রাক বা লরি আটকে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি মাঝরাস্তায় মালামাল ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। এই অস্থিতিশীল অবস্থায় ভালুকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে উদ্যোক্তারা দাবি করেন।

এমপি বাচ্চুর অনুসারীদের এমন তাণ্ডবের একটি লিখিত প্রমাণ মিলেছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গ্রিন ফ্যাক্টরি ‘এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেড’-এর একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র থেকে। গত ১১ জুলাই ময়মনসিংহ শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার বরাবর এনভয় টেক্সটাইলসের ডিজিএম  মো: সারোয়ার হোসেন একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, গত ৯ জুলাই দুপুর দেড় টার দিকে জামিরদিয়ায় অবস্থিত এনভয় টেক্সটাইলসের প্রধান ফটকের সামনে থেকে কারখানার কেমিক্যালের ব্যবহৃত খালি ড্রাম বহনকারী একটি ট্রাক একদল দুর্বৃত্ত জোরপূর্বক ছিনতাই করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে এনভয় কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও শিল্প পুলিশের জরুরি সহায়তায় ওই দিন রাত ৯ টার দিকে ট্রাকটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

এনভয় কর্তৃপক্ষ তাদের চিঠিতে সরাসরি দাবি করেছে যে, এই ট্রাক ছিনতাইয়ের ঘটনার সাথে ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো: ইব্রাহিম খলিল এবং ১০ নং হবিরবাড়ী ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক নেতা মো: সোহাগ মিয়াসহ তাদের বেশ কয়েকজন সহযোগী সরাসরি জড়িত ছিলেন। শুধু তাই নয়, ইব্রাহিম খলিল ও সোহাগ মিয়া ফ্যাক্টরি থেকে ওয়েস্টেজ বা ঝুট মালামাল বের না করার জন্য প্রকাশ্যে হুমকি প্রদান করে আসছেন। এছাড়াও, তারা প্রতিষ্ঠানের নতুন নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বালু, খোয়া, স্টোন চিপসহ অন্যান্য সামগ্রী বহনকারী গাড়ি কারখানায় প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন। এর ফলে এনভয় টেক্সটাইলসের সমস্ত নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এই ঘটনার পর রপ্তানিমুখী এই পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা ও নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বিএনপির পাঠানো এই শোকজ চিঠিতে ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর অতীত শৃঙ্খলা ভঙ্গের ইতিহাসও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয় ৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী সময়ে দলীয় শৃঙ্খলা বিরোধী বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ দলের সকল পর্যায়ের পদ থেকে তাঁকে গত ১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে প্রথমবার বহিষ্কার করা হয়েছিল। সে সময় ‘ভালুকা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্যাডে ‘এলজি বাটারফ্লাই ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি’র যাবতীয় কাজের ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়ার জন্য বাচ্চুর একটি বিতর্কিত সুপারিশপত্র নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনায় কাজ না পেয়ে কারখানায় হামলার জেরে পাঁচ দিন উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বাদী হয়ে বাচ্চুসহ ১৫-২০ জনের বিরুদ্ধে ভালুকা মডেল থানায় মামলাও করেন।

এরপর কৃত অপরাধের জন্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু লিখিতভাবে দুঃখ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আবেদন জানালে, দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর তাঁর সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে প্রাথমিক সদস্য পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পুনর্বহালের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু। ওই নির্বাচনে তিনি মোট ১ লাখ ১০ হাজার ২১৪ ভোট পেয়েছিলেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিদ্রোহী প্রার্থী মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম পেয়েছিলেন ৬৫ হাজার ৫৯১ ভোট।

৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এমপি বাচ্চু সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে তাঁর বিরুদ্ধে দল থেকে চূড়ান্ত বহিষ্কারসহ কঠোর আইনি ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করেছে দলীয় সূত্র।






Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy