
X
করতোয়া নদীর তীরে ভয়াবহ ক্ষয়
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, মাটি কাটা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের গাছ নির্বিচারে কর্তনের কারণে করতোয়া নদীর তীর সংরক্ষণ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ধস, ফাটল ও ভাঙন দেখা দিয়েছে।
গত ২৪ জুলাই (শুক্রবার) দুপুরে উপজেলার কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের দিঘলকান্দী এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ থেকে কয়েক লাখ টাকার গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানতে সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য-সচিবের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ছুটির দিনের কথা উল্লেখ করে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তীরসংলগ্ন এলাকায় ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয় এবং তলদেশে গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়। এতে পানির স্রোতের গতিবেগ বৃদ্ধি পেয়ে বাঁধের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে নদীর তীব্র স্রোতে বাঁধে ধস ও ফাটল সৃষ্টি হয় এবং সামান্য পানির চাপেই বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ বিষয়ে ২ নম্বর হোসেনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তৌফিক আমিন টিটু বলেন, “রাতের আঁধারে বালু, মাটি ও গাছ কাটা হয়। এসব ঘটনায় একাধিকবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানাও করা হয়েছে।”
১ নম্বর কিশোরগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কর বলেন, “আমার ইউনিয়নের বাঁধের এলাকা অনেক বড়। তারপরও গ্রাম পুলিশ দিয়ে নিয়মিত টহল দেওয়া হচ্ছে। রাতের বেলায় বালু, মাটি ও গাছ কাটার খবর লোকমুখে শুনি। এসব রোধে ইউনিয়ন পরিষদ সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।”
কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের সদস্য সালাম বলেন, “নদী ও বাঁধের এলাকা বিশাল হওয়ায় সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো কঠিন। তারপরও আমরা সর্বদা সতর্ক রয়েছি।”
হোসেনপুর ইউনিয়নের সদস্য সেলিম জানান, “গ্রামবাসী পালাক্রমে বাঁধ পাহারা দিচ্ছে, যাতে কেউ মাটি, বালু বা গাছ কাটতে না পারে।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত করতোয়া নদীর তীরসংলগ্ন কিশোরগাড়ী ও হোসেনপুর ইউনিয়নের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও তীর সংরক্ষণ বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অতীতে বিভিন্ন সময়ে বাঁধের ওপর রোপণ করা মূল্যবান গাছও বিভিন্ন সমিতির নাম ব্যবহার করে কেটে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত একটি প্রভাবশালী চক্রের কারণে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিশোরগাড়ী এলাকার এক ব্যক্তি ‘মানান’-এর নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো থেকে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। একইভাবে বাঁধের গাছও কেটে নেওয়া হয়েছে। এর ভয়াবহ পরিণতি এখন নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকায় পড়েছে।
গত বন্যায় এই বাঁধের কারণে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে মানুষ রক্ষা পেলেও বর্তমানে বাঁধের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ধস, ফাটল ও ভাঙনের কারণে দুই ইউনিয়নের শতাধিক পরিবার চরম উদ্বেগ ও দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন ও গাছ কর্তনের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে স্থায়ীভাবে এসব কার্যক্রম বন্ধ করা না হলে করতোয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ যে কোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। তখন হাজারো মানুষের জীবন ও সম্পদ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।