
X
সংগৃহীত ছবি
ময়মনসিংহ নগরীর ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন পার্কের নিরিবিলি পরিবেশে গড়ে ওঠা ভাষাসৈনিক এম এ মতিন পাঠাগার একসময় ছিল শিক্ষার্থী, গবেষক ও বইপ্রেমীদের অন্যতম আশ্রয়স্থল। ২০১৬ সালে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অ্যাডভোকেট মোস্তফা এম এ মতিনের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই আধুনিক গণপাঠাগারে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার বই রয়েছে।
ইতিহাস, সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, রাজনীতিসহ নানা বিষয়ের বই নিয়ে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পাঠকদের পদচারণায় মুখর থাকত পাঠাগারটি। তবে প্রায় এক মাস ধরে সংস্কারের কারণ দেখিয়ে এটি বন্ধ রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিয়মিত শিক্ষার্থী, গবেষক ও সাধারণ পাঠকরা। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের দাবি, সংস্কার শেষে পাঠকদের জন্য নতুন ব্যবস্থাপনা চালু করে দ্রুতই পাঠাগার খুলে দেওয়া হবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাঠাগারের মূল ফটকে তালা ঝুলছে। বই পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে যাচ্ছেন। পার্কে ঘুরতে আসা অনেকেই বন্ধ পাঠাগারের সামনে এসে হতাশা প্রকাশ করেন।
নিয়মিত পাঠক ও কলেজ শিক্ষার্থী উপমা সরকার বলেন, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই পাঠাগারটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা এখানে বসে পড়াশোনা করতাম। শুধু নিজের বই নয়, পাঠাগারের বইও পড়তাম। এতদিনেও এটি চালু না হওয়ায় আমাদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত পাঠাগার খুলে দেওয়ার দাবি জানাই।
চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থী রাকিব হাসান বলেন, ময়মনসিংহ শহরে নিরিবিলি পরিবেশে পড়াশোনার মতো জায়গা খুবই কম। এম এ মতিন পাঠাগার আমাদের জন্য সবচেয়ে উপযোগী ছিল। সংস্কারের নামে দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আরেক শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম বলেন, আমরা একাধিকবার সিটি করপোরেশন ও বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরে গিয়েছি। আশ্বাস ছাড়া এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখিনি। দ্রুত পাঠাগার চালু করা প্রয়োজন।
তবে পাঠাগার কর্তৃপক্ষ বলছে, সমস্যার মূল কারণ ভিন্ন। অনেক শিক্ষার্থী পাঠাগারের বই না পড়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজেদের পাঠ্যবই নিয়ে বসে থাকেন। এতে সাধারণ পাঠকরা আসন পান না।
এম এ মতিন পাঠাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, পাঠাগারটি মূলত এখানকার বই পাঠের জন্য। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিজেদের বই নিয়ে সারাদিন বসে থাকেন। সাধারণ পাঠকদের জন্য বসার জায়গা থাকে না। অনেক সময় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতিরও মুখোমুখি হতে হয়।
সহকারী গ্রন্থাগারিক সুমন মন্ডল বলেন, আমরা কাউকে বই পড়তে নিরুৎসাহিত করি না। কিন্তু একজন যদি সারাদিন একটি আসন দখল করে রাখেন, তাহলে নতুন পাঠক বসার সুযোগ পান না। পাঠাগারের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন।
পার্কে ঘুরতে আসা সাধারণ দর্শনার্থী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অনেকবার ইচ্ছা হয়েছে পাঠাগারে গিয়ে বই পড়ব। কিন্তু ভেতরে গিয়ে দেখি সব আসন দখল। বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের বই পড়ছেন। এতে নতুন পাঠক তৈরি হওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে।
আরেক দর্শনার্থী নাসরিন আক্তার বলেন, পাঠাগারটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা। কিন্তু এটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ বই পড়ার সুযোগ হারাচ্ছেন। দ্রুত খুলে দেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রোকনুজ্জামান রুকন বলেন, সংস্কারকাজের প্রয়োজনেই সাময়িকভাবে পাঠাগারটি বন্ধ রাখা হয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে সংস্কার কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। তবে দূতই সংস্কার শেষে পাঠকদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা করা হবে। পাঠাগারের মূল উদ্দেশ্য হলো সবাই যেন সমানভাবে বই পড়ার সুযোগ পান।
তিনি আরও বলেন, পার্কে ঘুরতে আসা সাধারণ দর্শনার্থী কিংবা নতুন পাঠকরাও যেন পাঠাগার ব্যবহার করতে পারেন, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। সংস্কার শেষ হলেই পাঠাগারটি পুনরায় চালু করা হবে।
এম এ মতিন পাঠাগারকে ঘিরে এখন দুটি ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে। একদিকে নিয়মিত শিক্ষার্থীরা বলছেন, এটি বন্ধ থাকায় তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের দাবি, পাঠাগারকে প্রকৃত অর্থে সবার জন্য উন্মুক্ত ও কার্যকর করতে নতুন নিয়ম প্রয়োজন। এখন সংস্কার শেষে কী ধরনের ব্যবস্থাপনা চালু হয় এবং কবে আবার পাঠাগারের দরজা পাঠকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন ময়মনসিংহের বইপ্রেমীরা।