
X
ব্রিটিশ কবি হলি ম্যাকনিশ
কবিতা, মঞ্চে আবৃত্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছোট ভিডিওর মাধ্যমে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছেছেন হলি ম্যাকনিশ। যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে আলোচিত ও বহুল পঠিত সমসাময়িক কবিদের অন্যতম ম্যাকনিশের কাছে ইংরেজি ভাষার সবচেয়ে অপছন্দের শব্দটি হল— "Virgin (ভার্জিন)"। তার বিশ্বাস, ‘ভার্জিনিটি’ বা কুমারীত্ব একটি সামাজিক মিথ। এই ধারণাকে অযথাই অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন এটি মানুষের পরিচয় ও মর্যাদা নির্ধারণ করে।
কেমব্রিজে ১৬ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে বসবাসকারী ম্যাকনিশ জানান, মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই তিনি প্রথম ‘ভার্জিন’ শব্দটি শোনেন। স্কুলের বড়দিনের নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে ছোটবেলাতেই তিনি বুঝেছিলেন যিশুর মা মেরিকে বিশেষ করে তুলেছে তার 'কুমারী' পরিচয়। কিন্তু যোসেফের ভার্জিনিটি নিয়ে কেন কেউ কখনো কথা বলেনা—বিষয়টি নিয়ে তার খটকা লাগে।
আর সেই থেকেই ভার্জিনিটি বা কুমারীত্ব তার কাছে অদ্ভুত, এমনকি কিছুটা ভয়ংকর মনে হয়েছে। একইসঙ্গে 'কুমারীত্ব' নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি বা কথা বলার ধরণ সব সময়ই তাকে অস্বস্তিতে ফেলে।
মাত্র সাত বছর বয়সেই হলি ম্যাকনিশের প্রথম কবিতা লেখা। একটি বিড়াল পুষতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরিবার রাজি হয়নি। সেই অভিমান থেকেই ছন্দ মিলিয়ে পরিবারের সদস্যদের ব্যঙ্গ করে একটি কবিতা লিখেছিলেন ছোট্ট হলি। অবশ্য বহু বছর পর তাঁর মা চিলেকোঠায় সেই কবিতাটি খুঁজে পেয়েছিলেন। ম্যাকনিশের ভাষায়, ছোটবেলা থেকেই তার কাছে কবিতা ছিল নিজের অনুভূতি প্রকাশ, কষ্ট সামলানো এবং চারপাশের পৃথিবীকে বোঝার সবচেয়ে স্বাভাবিক মাধ্যম।
এই কবি বিশ্বাস করেন, ইংরেজি ভাষায় খুব কম শব্দই আছে, যার সামাজিক ও মানসিক প্রভাব 'ভার্জিন' শব্দটির মতো গভীর। এমন প্রভাবের কারণেই ১৯ বছর বয়সে প্রথম যৌন সম্পর্কে জড়ানোর পর প্রায় আধা ঘণ্টা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। মনে হয়েছিল, নিশ্চয়ই নিজের মধ্যে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে পাবেন। এমনকি কীভাবে একজন ‘অ-কুমারী’ মানুষের মতো দাঁড়াবেন, সেটিও ভাবছিলেন, যাতে পরিবারের কেউ কিছু বুঝতে না পারে। রাতের খাবারের টেবিলে সবাই যখন ম্যাশড পটেটো খাচ্ছিল, তখনও তাঁর মনে হচ্ছিল, বাবা–মা যেন তাঁকে অন্যরকম চোখে দেখছেন।
কৈশোরে ডায়েরির পাতাজুড়ে লিখেছেন অসংখ্য কবিতা। পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র মনে রাখার জন্যও ছন্দ তৈরি করতেন। তাঁর ভাষায়, যে বিষয়গুলো একেবারেই ভালো লাগত না, কবিতা সেগুলোও আনন্দের করে তুলত। তবে স্কুলজীবনে বাধ্যতামূলকভাবে কবিতা পড়তে গিয়ে একসময় কবিতার প্রতিই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
সীমাস হিনির বিখ্যাত- 'ডিগিং' কবিতাটি পড়তে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছিল, ‘আলু নিয়ে লেখা একটা কবিতা আমরা কেন পড়ছি?’ তখন কবিতাও অন্য সবার মতো তাঁর কাছেও ছিল পরীক্ষার একটি বিষয় মাত্র। অথচ সময়ের সঙ্গে সেই সীমাস হিনিই হয়ে ওঠেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় কবিদের একজন।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ও মধ্যযুগীয় ভাষা বিষয়ে পড়াশোনা শেষে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ম্যাকনিশের মতে মাত্র ছয় অক্ষরের একটি শব্দ—Virgin-এর চাপ পাহাড়সম। 'কুমারীত্ব' শব্দটিকে মানুষ জীবনের অন্য যেকোনো ‘প্রথম’ অভিজ্ঞতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করে।
তার দৃষ্টিতে, জীবনে প্রথমবারের অভিজ্ঞতা তো অসংখ্য—প্রথম হাঁটা, প্রথম স্কুলে যাওয়া, প্রথম চাকরি কিংবা প্রথম প্রেম। কিন্তু শুধু যৌন অভিজ্ঞতাকেই এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন সেটিই একজন মানুষের পরিচয় বদলে দেয়—একজন ‘কুমার’ থেকে ‘অ-কুমার’- এ রূপান্তর ঘটায়।
কৈশোরে বন্ধুদের কাছ থেকে তাকে বারবার শুনতে হয়েছে, ‘তুমি কি এখনও কুমারী?’
ম্যাকনিশ মনে করেন, কৌমার্য কোনো বাস্তব বা প্রাকৃতিক সত্য নয়; এটি মানুষের তৈরি একটি সামাজিক ধারণা। তাঁর ভাষায়, এই ধারণার জন্ম এমন এক সময়ে, যখন দাসপ্রথা কিংবা পাথর ছুড়ে মৃত্যুদণ্ডের মতো প্রথাকেও সমাজ ইতিবাচকভাবে দেখত।
তাঁর মতে, ইতিহাসজুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এই ধারণাকে ব্যবহার করা হয়েছে মানুষকে—বিশেষ করে নারীদের—নিয়ন্ত্রণ, লজ্জিত করা, প্রশংসা করা কিংবা তাদের পরিচয় নির্ধারণের হাতিয়ার হিসেবে।
কেমব্রিজে ভর্তি হওয়া ছিল কবির জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। কিন্তু শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে ভাষাগত উচ্চারণ, সাধারণ এলাকায় বসবাস এমনকি মা একজন নার্স—এসব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সূক্ষ্ম সামাজিক শ্রেণিবৈষম্যের মুখোমুখি হওয়া ম্যাকনিশ বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেই নতুন করে কবিতা লেখা শুরু করেন। বই পড়া, লেখা এবং ওপেন মাইক অনুষ্ঠানে নিজের কবিতা পাঠ করতে করতেই একসময় এসবই হয়ে উঠেছে তার পূর্ণকালীন পেশা। সম্প্রতি কুমারীত্ব, ভালোবাসা এবং মানুষের শরীর নিয়ে সমাজের তৈরি নানা ধারণাই উঠে এসেছে ৪৩ বছর বয়সী এই কবির প্রকাশিত নতুন কাব্যগ্রন্থ Virgin-এ।
কুমারীত্ব প্রশ্নে সব সময়ই স্পষ্টভাষী হলি ম্যাকনিশ। নিজের প্রথম যৌন অভিজ্ঞতা তার কাছে অত্যন্ত আনন্দময়, স্বাভাবিক এবং সম্পূর্ণ কষ্টহীন। তাই প্রথম যৌন সম্পর্কে ব্যথা পাওয়াকেই ‘পবিত্রতার প্রমাণ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচলিত সামাজিক বয়ানকে তিনি ভয়াবহ এক মিথ্যাচার বলে মনে করেন। একারণেই ‘কুমারীত্ব হারানো’ প্রসঙ্গ উঠলেই তার জবাব, ‘সেদিন আমি কিছুই হারাইনি; হারিয়েছিলাম শুধু একটি স্যান্ডেল।’
লেখক: সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক