রবীন্দ্রসংগীতে মৃত্যুচেতনার স্বরূপ

এইচ. এম. এ. হক বাপ্পি

সাহিত্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু-সংক্রান্ত গানগুলো নিয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক অভ্যাস এক ধরনের স্থির অর্থ তৈরি করেছে। আমাদের মৃত্যুচিন্তা কিংবা প্রিয়জনে

2026-08-06T19:19:37+00:00
2026-08-06T19:19:37+00:00
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬
   
রবীন্দ্রসংগীতে মৃত্যুচেতনার স্বরূপ
এইচ. এম. এ. হক বাপ্পি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬, ৭:১৯ পিএম   (ভিজিট : ১৭)
রবীন্দ্রসংগীতে মৃত্যুচেতনার স্বরূপ
X

রবীন্দ্রসংগীতে মৃত্যুচেতনার স্বরূপ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু-সংক্রান্ত গানগুলো নিয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক অভ্যাস এক ধরনের স্থির অর্থ তৈরি করেছে। আমাদের মৃত্যুচিন্তা কিংবা প্রিয়জনে স্মরণে সবচেয়ে বেশি শোনা বা গাওয়া গানের মধ্যে- ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’, ‘সমুখে শান্তি পারাবার’ কিংবা ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু’। ফলে এই গানগুলো বাঙালি মননে মূলত বিদায়, শোক ও বিচ্ছেদের গান হিসেবে গেথে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- রবীন্দ্রনাথ কি সত্যিই এই গানগুলিতে মৃত্যুর বেদনায় লিখেছেন? নাকি আমরা তার দর্শনের একটি ক্ষুদ্র অংশকে সামগ্রিক অর্থে ধরে নিয়েছি?

রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্য পাঠ করলে দেখা যায়, মৃত্যু তার কাছে কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; বরং জীবনদর্শনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। জীবন, প্রকৃতি, প্রেম, ঈশ্বর এবং সৃষ্টির সঙ্গে যেমন তার গভীর সম্পর্ক, তেমনি মৃত্যুর সঙ্গেও তার সম্পর্ক ভয়ের নয়, জিজ্ঞাসার; অন্ধকারের নয়, আলোর। তিনি মৃত্যুকে কখনো অস্বীকার করেননি, আবার তাকে চূড়ান্ত সত্য বলেও মেনে নেননি। তার কাছে মৃত্যু এমন একটি দ্বার, যার ওপারে রয়েছে বৃহত্তর অস্তিত্বের সম্ভাবনা।

এই দৃষ্টিভঙ্গির শিকড় নিহিত ভারতীয় উপনিষদীয় দর্শনে। বিশেষ করে বৃহদারণ্যক উপনিষদ-এর শান্তিমন্ত্র- ‘অসতো মা সদ্গময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়’- রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্যজুড়ে নানা রূপে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এই মন্ত্রে মৃত্যুর বিপরীতে জীবনের কথা বলা হয়নি; বলা হয়েছে অমৃতের কথা। অর্থাৎ, মৃত্যু কোনো পরাজয় নয়; এটি সীমিত সত্তা থেকে অসীমের দিকে যাত্রা।

রবীন্দ্রনাথ ধর্মীয় তত্ত্বকে আক্ষরিকভাবে পুনরাবৃত্তি করেননি; তিনি তাকে কাব্য, সঙ্গীত ও নন্দনতত্ত্বে রূপ দিয়েছেন। তাই তার মৃত্যুবিষয়ক গানগুলোতে বিচ্ছেদের পাশাপাশি রয়েছে পুনর্মিলনের আকাক্সক্ষা, বিস্মরণের সম্ভাবনার মধ্যেও আত্মার ধারাবাহিকতার বিশ্বাস। গীতবিতান-এর পূজা পর্যায়ে মৃত্যু ঈশ্বরের সান্নিধ্যের ভাষা হয়ে ওঠে। ‘মরণ রে, তুঁহুঁ মম শ্যামসমান’ গানে মৃত্যু কোনো ভয়ংকর শক্তি নয়; বরং প্রিয়তমের রূপ। ভারতীয় ভক্তিবাদের এই চিত্রকল্পকে রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগত আত্মবোধ ও বিশ্বমানবিক চেতনার উচ্চতায় উন্নীত করেছেন।

একই দর্শন গীতাঞ্জলি-তেও প্রবলভাবে প্রতিফলিত। সেখানে মৃত্যু দেহের অবসান নয়; অহংকারের বিলয় এবং অসীমের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার পথ। তাই ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’- গানটি বিস্মৃত হওয়ার আক্ষেপের গান নয়; বরং ‘আমিত্ব’ অতিক্রম করে জীবনের চিরন্তন প্রবাহকে স্বীকার করার গান। পৃথিবী ব্যক্তির জন্য থেমে থাকে না- ঘাস গজায়, ফুল ফোটে, নদী বয়ে যায়, জীবন তার নিজস্ব ছন্দে এগিয়ে চলে। এই উপলব্ধিই রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু।

এই দৃষ্টিভঙ্গি তাকে পাশ্চাত্যের শোককেন্দ্রিক মৃত্যুচেতনা থেকে পৃথক করেছে। তার কাছে মৃত্যু সমাপ্তি নয়, আত্মোত্তরণ; ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী হলেও সৃষ্টি, প্রেম ও চেতনা অবিনশ্বর। বলাকা-য় তিনি মৃত্যুকে বিশ্ববিবর্তনের স্বাভাবিক গতি হিসেবে দেখেছেন, শেষ লেখা-য় মৃত্যুকে গ্রহণ করেছেন নির্মোহ শান্তিতে, আর ‘সঙ্গীতের মুক্তি’ প্রবন্ধে ইঙ্গিত দিয়েছেন- গানের অন্তর্লীন দর্শন উপলব্ধি করার জন্য প্রয়োজন গভীর শ্রবণশক্তি। তাই রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুবিষয়ক গান কেবল বিষাদের নয়; শব্দ, সুর, দর্শন ও উপনিষদীয় অমৃতচেতনার সম্মিলনে নির্মিত এক অনন্ত জীবনদর্শনের শিল্পরূপ, যেখানে মৃত্যু অন্ধকার নয়, অসীমের দিকে এক আলোকযাত্রা।

শব্দচয়নের অন্তর্লীন দর্শন
রবীন্দ্রনাথের গানে মৃত্যু খুব কমই প্রত্যক্ষভাবে উচ্চারিত হয়েছে। ‘মরণ’, ‘বিদায়’, ‘শেষ’ বা ‘নেই’-এর পাশাপাশি তিনি এনেছেন ‘প্রভাত’, ‘আলো’, ‘পথ’, ‘খেয়া’, ‘পারাবার’, ‘অমৃত’ ও ‘আনন্দ’-এর মতো জীবনমুখী প্রতীক। ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’ গানে তিনি বলেননি, ‘যখন আমি মরে যাব’; বলেছেন, ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন’- অর্থাৎ মৃত্যু নয়, অনুপস্থিতির মধ্যেও জীবনের ধারাবাহিকতাই তার ভাবনার কেন্দ্র। আর শেষ পঙ্ক্তি-‘তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি’- জানিয়ে দেয়, দেহের অবসান হলেও সৃষ্টিশীল আত্মা, চেতনা ও বিশ্বসত্তার সঙ্গে মানুষের অস্তিত্ব অম্লান থাকে। 

চিত্রকল্প: প্রকৃতির মধ্যে আত্মবিলয়
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু-ভাবনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার প্রকৃতিনির্ভর চিত্রকল্প। তিনি কবর, শ্মশান, ছাই কিংবা অন্ধকারের প্রতীক ব্যবহার করেন না। বরং তিনি আঁকেন- ধুলোমাখা তানপুরা, আগাছায় ঢাকা বাগান, শ্যাওলাধরা দিঘি ইত্যাদি। এইসব চিত্রের মধ্যে মৃত্যু জীবনের প্রতিপক্ষ নয়; জীবনেরই অনিবার্য পরিণতি। প্রকৃতি মানুষের অনুপস্থিতিতে শূন্য হয় না; বরং তার নিজস্ব ছন্দে চলতে থাকে। এই উপলব্ধি কবিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে মহাজাগতিক চেতনার দিকে নিয়ে যায়।

নন্দনতত্ত্ব: সৌন্দর্যের মধ্যে সত্য
রবীন্দ্রনাথের নন্দনতত্ত্বের মূল কথা- সত্য, সুন্দর এবং মঙ্গল পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। তার কাছে শিল্পের উদ্দেশ্য কেবল আবেগ জাগানো নয়; মানুষের চেতনার প্রসার ঘটানো। তাই মৃত্যুর গানে তিনি কৃত্রিম বিলাপ বা নাটকীয় শোক নির্মাণ করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্প যদি মানুষকে বৃহত্তর সত্যের দিকে নিয়ে যেতে না পারে, তবে সেই শিল্প অসম্পূর্ণ। এ কারণেই তার গানের বিষাদ কখনো অবসাদে পর্যবসিত হয় না। তা ধীরে ধীরে রূপ নেয় প্রশান্তিতে। এই প্রশান্তিই তার সংগীতের নন্দনরস।
বিস্মরণের আক্ষেপ, না প্রত্যাবর্তনের বিশ্বাস?

‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন’ গানটিকে অনেকেই বিস্মৃত হয়ে যাওয়ার বেদনার গান মনে করেন। কিন্তু গভীর পাঠে দেখা যায়, এটি বিস্মরণের আক্ষেপ নয়; বরং বিস্মরণের স্বাভাবিকতাকে মেনে নেওয়ার গান। কবি জানেন, একদিন ঘরে ধুলো জমবে, তানপুরা নীরব হবে, বাগান আগাছায় ঢেকে যাবে। কিন্তু এ নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই। কারণ ব্যক্তি নয়, জীবনই চিরন্তন। 

এই উপলব্ধির চূড়ান্ত প্রকাশ- ‘তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি।’ এখানে ‘আমি’ দেহসত্তা নয়; বিশ্বচেতনায় মিলিত সৃষ্টিশীল আত্মা। তাই রবীন্দ্রনাথ বিস্মরণের বিরুদ্ধে স্মৃতির লড়াই করেননি; তিনি ব্যক্তিসত্তার সীমা অতিক্রম করে সৃষ্টির মধ্যেই অনন্ত উপস্থিতির কথা বলেছেন। তার গানে প্রয়াণ তাই সমাপ্তি নয়, বরং জীবন, সৌন্দর্য ও উপনিষদীয় অমৃতচেতনায় প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি।

মৃত্যুর ওপারে যে জীবন
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তা উপনিষদের অদ্বৈত দর্শন, বৈষ্ণব ভাবধারা, বাউল-সাধনা, কবীরের নির্গুণ তত্ত্ব এবং তার নিজস্ব মানবতাবাদের এক অনন্য সংশ্লেষ। তাই তার কাছে মৃত্যু সমাপ্তি নয়; আত্মার উত্তরণ, বিশ্বচেতনায় মিলন এবং অমৃতের অভিযাত্রা। গীতাঞ্জলি-তে মৃত্যু নীরব অতিথি, যাকে কবি পূর্ণতার বোধ নিয়ে স্বাগত জানান; বলাকা-য় জন্ম ও মৃত্যু একই চিরপ্রবহমান গতির দুটি তরঙ্গ; শেষ লেখা-য় দীর্ঘ অসুস্থতার মধ্যেও মৃত্যু নয়, বরং জীবন, সৃজনশীলতা ও চেতনার অবিনশ্বরতার উপলব্ধিই প্রধান হয়ে ওঠে। আর সঙ্গীতের মুক্তি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের উক্তি- ‘শুনিবারও প্রতিভা থাকা চাই, কেবল শুনাইবার নয়’- জানিয়ে দেয়, তার মৃত্যুবিষয়ক গান কেবল বিষাদের নয়, গভীর জীবনদর্শনেরও ভাষা। তাই ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন’, ‘সমুখে শান্তি পারাবার’ কিংবা ‘জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে’- এসব গান শোকের নয়; আত্মোত্তরণ, অমৃতচেতনা এবং অনন্ত জীবনের উপলব্ধির সংগীত।

প্রয়াণ নয়, অমৃতের আহ্বান
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তা গড়ে উঠেছে উপনিষদের অদ্বৈত দর্শন, বাউল-সহজিয়া সাধনা, কবীরের নির্গুণ ভাবনা এবং তার নিজস্ব মানবতাবাদের এক অনন্য সংশ্লেষে। তাই তার গানে মৃত্যু কখনো কেবল শোক বা বিচ্ছেদের প্রতীক নয়; বরং আত্মোত্তরণ, অমৃতচেতনা ও বিশ্বসত্তার সঙ্গে মিলনের অভিজ্ঞতা।

এই কারণেই রবীন্দ্রনাথের গানে ‘প্রয়াণধারা’ নামে কোনো আনুষ্ঠানিক পর্যায় নেই। তার মৃত্যুবিষয়ক গানকে ‘শোকসংগীত’ বলাও যথার্থ নয়। কারণ, পাশ্চাত্যের এলিজিতে যেখানে ব্যক্তিগত শোক মুখ্য, সেখানে রবীন্দ্রনাথের গানে মৃত্যু আত্মার মুক্তি, জীবনের ধারাবাহিকতা এবং অসীমের আহ্বান। তার গানের অন্তিম বাণী তাই শোক নয়; আশা। বিদায় নয়; প্রত্যাবর্তনের বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে অমর হয়ে থাকার উপলব্ধিতেই রবীন্দ্রসংগীত পরিণত হয়েছে এক অনন্ত জীবনদর্শনে।

রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর আক্ষেপ লেখেননি; তিনি লিখেছেন মৃত্যুর মধ্যেও জীবনের ধারাবাহিকতা। বিস্মরণের সম্ভাবনাকে তিনি অস্বীকার করেননি, কিন্তু তাকে চূড়ান্ত সত্যও মানেননি। তার গানে মৃত্যু কখনো শেষ নয়; এটি আত্মার প্রসার, সৃষ্টির ধারাবাহিকতা এবং মহাজীবনের সঙ্গে মিলনের এক অনিবার্য পর্ব।





Loading...
Loading...


সাহিত্য এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy