
X
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষনা করেন সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাড বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন।
দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র চার মাসের মাথায় জলাবদ্ধতা দুরিকরণসহ ডজনখানেক অভুতপূর্ব সাফল্যের পর কোনো ধরনের নতুন করারোপ ছাড়াই ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৬৪৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের (বিসিসি) প্রশাসক অ্যাড বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন। বাজেটে নগর উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, খাল সংরক্ষন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নারী ও শিশু কল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ডিজিটাল নাগরিকসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিকালে নগর ভবনে এ বাজেট ঘোষনা করেন তিনি।
বরিশাল নগরীর রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ঘোষিত বাজেটে সভাপতি হিসেবে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাড বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, সীমিত রাজস্ব আয়ের মধ্যেও নাগরিক সেবার মান বাড়াতে কর বৃদ্ধি না করেই এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিকল্পিত, সবুজ, পরিচ্ছন্ন, নারী ও শিশুবান্ধব স্মার্ট মহানগরী গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। একটি স্মার্ট ও পরিচ্ছন্ন নগরীর প্রত্যয় নিয়ে সাত পৃষ্ঠার একটি বাজেট পরিকল্পনা পেশ করেন প্রশাসক শিরীন। ঘোষিত বাজেটে নগরীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ব্যাপক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জেলখাল, আমানতগঞ্জ, সাগরদী ও লাকুটিয়া খাল পুনঃখনন এবং খালের পাড় সংরক্ষণের জন্য ৭৬৯ কোটি ৪০ লাখ টাকার প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন হলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে কীর্তনখোলা নদীর পশ্চিম তীরে শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ৫৩৩ কোটি টাকার প্রকল্পের কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় জানানো হয়, রূপাতলী সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালু হয়েছে এবং বেলতলা ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালুর প্রস্তুতি চলছে। ভবিষ্যতের পানির চাহিদা পূরণে কীর্তনখোলা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হয়েছে।
এছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নতুন পাইপলাইন স্থাপন অব্যাহত রয়েছে। তিনি প্রশাসকের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৬৪টি নতুন পানির সংযোগ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নাগরিকদের জন্য নতুন পানি সংযোগ আবেদন থেকে অনুমোদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে চালু করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে নগরীতে পানির এটিএম বুথ স্থাপনেরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি কথা জানিয়ে বলেন, প্রতিদিন প্রায় ২০০ টন বর্জ্য অপসারণ করছে সিটি কর্পোরেশন। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের মাধ্যমে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৪টি ডাম্প ট্রাক, একটি মেডিকেল বর্জ্যবাহী কম্প্যাক্টর ট্রাক এবং একটি ভ্যাকুয়াম ট্রাক সংগ্রহ করা হয়েছে। গত ঈদুল আজহায় সরকার নির্ধারিত ১২ ঘণ্টার পরিবর্তে মাত্র ৬ ঘণ্টায় কোরবানির বর্জ্য অপসারণে সক্ষম হয়েছিলো বরিশাল সিটি কর্পোরেশন।
নারী, শিশু ও সামাজিক সুরক্ষায় বিশেষ বরাদ্দর কথা জানিয়ে বলেন, বাজেটে নারীদের জন্য আধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ মার্কেট, অসচ্ছল নারীদের আইনি সহায়তা এবং কর্মজীবী নারীদের জন্য হোস্টেল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শিশুদের জন্য গ্রীন সিটি পার্ক সংস্কার, নতুন রাইড স্থাপন, খেলাধুলার সরঞ্জাম ক্রয় এবং বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজনেও বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শহরের কাছেই ইকো পার্ক নির্মানের কার্যক্রম ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাাজেটে আগামী অর্থবছরে ৫০ হাজার বৃক্ষরোপণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনে নতুন ফোয়ারা, পার্ক উন্নয়ন, আলোকসজ্জা এবং “সবার আগে বাংলাদেশ” নামে মানচিত্র ভাস্কর্য নির্মাণের বিষয়ও তুলে ধরা হয়।
বাজেটে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের কথা বলতে গিয়ে বলেন, কর আদায়, ট্রেড লাইসেন্স, ভবনের নকশা অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা অনলাইনে নিয়ে আসার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসকের দাবি, এতে সেবার গতি বাড়বে এবং হয়রানি কমবে।
সড়ক, ড্রেন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রসংঙ্গে বলেন, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ৪২ কিলোমিটার বিটুমিনাস কার্পেটিং সড়ক, ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার আরসিসি সড়ক, ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার সিসি সড়ক এবং ১৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। নগরীর আলোকায়নে প্রায় ২৪ কোটি ৭৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকার প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন মিললে ১৬ হাজারের বেশি বৈদ্যুতিক খুঁটি ও ২০ হাজারের বেশি নতুন সড়কবাতি স্থাপন করা হবে।
স্বাস্থ্য ও টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে বলেন, গত অর্থবছরে ১০ হাজার ৪৭৯ জন নারী ও শিশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়েছে। হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে ৪৩ হাজার ৮৫০ জন এবং ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইনে ৫৮ হাজার ৫৫৭ জন শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগামী অর্থবছর থেকে নগরীর তিনটি জোনে নারী ও শিশুদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে বলে বাজেটে জানানো হয়। বরিশাল প্রেসক্লাব ও বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির ভবন সংস্কারের জন্যও ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতার শেষদিকে প্রশাসক শিরীন বলেন, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং অপচয় রোধের মাধ্যমে নাগরিক সেবার মান আরও উন্নত করা হবে। তিনি নগরবাসী, সাংবাদিক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, “কর বৃদ্ধি না করেও নগরবাসী আগের চেয়ে আরও বেশি নাগরিক সুবিধা পাবেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়েই একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও স্মার্ট বরিশাল গড়ে তুলতে চাই।”
উল্লেখ্য ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ৫২০ কোটি ৮৬ লাখ ১৬ হাজার ৯২৮ টাকা। সংশোধিত বাজেট দাঁড়িয়েছে ৪৬২ কোটি ৮৬ লাখ ২২ হাজার ৮৩৭ টাকা।
বাজেট অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রেজাউল বারী, সচিব রুম্পা সিকদার, প্রধান প্রকৌশলী মোঃ হুমায়ন কবির, বীর মুক্তিযোদ্ধা ফরিদ উদ্দিন, সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র আলতাফ হোসেন, বিএনপি নেতা আক্কাস হোসেন, মীর জাহিদুল কবীর, ড্যাবের জেলা সভাপতি ডাঃ কবিরুজ্জামানসহ নাগরীক সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।