
X
ফাইল ছবি
হাওরবেষ্টিত আজমিরীগঞ্জ উপজেলার ৩১ শয্যা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে কিন্তু ভবন নির্মাণ হলেও চালু হয়নি ৫০ শয্যার কার্যক্রম।
নিশ্চিত হয়নি মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবা। ১৯টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের বিপরীতে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাসহ কর্মরত মাত্র ৮ জন। ২৫টি সিনিয়র স্টাফ নার্সের পদের বিপরীতে আছেন ৯ জন। হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন থাকলেও নেই টেকনিশিয়ান। গাইনী চিকিৎসক থাকলেও নেই অ্যানেসথেসিওলজিস্ট।
প্রায় নয় বছর ধরে বন্ধ সিজারিয়ান অপারেশন। নবজাতক শিশুদের চিকিৎসার জন্যও নেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। এমনকি রাতের নিরাপত্তার জন্যও নেই নৈশ প্রহরীও। পাশাপাশি হাসপাতালে নেই ফার্মাসিস্ট ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেবা। নাজুক ওয়ার্ডে থাকা পুরোনো শয্যাগুলোর অবস্থাও।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের কয়েকটি শয্যার চাদর অপরিষ্কার ও ছেঁড়া। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ- শিশু রোগীরা শয্যায় মলমূত্র ত্যাগ করলেও অনেক সময় গদি যথাযথভাবে পরিষ্কার না করে তার ওপর পুরাতন চাদর বিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে একই শয্যায় একাধিক রোগীকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে। এমনকি কয়েকটি বালিশে রক্তের দাগও দেখা গেছে। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে শয্যাগুলো নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে। এতে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীদের ভোগান্তির পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার জন্য নতুন ভবন নির্মাণ করা হলেও এখনো ৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি। কাগজে-কলমে হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়লেও বাস্তবে প্রয়োজনীয় জনবল ও সেবা না থাকায় এর সুফল পাচ্ছেন না উপজেলার মানুষ।
১৯টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ১১টি। কর্মরত ৮ জন চিকিৎসকের মধ্যে রয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাও। ফলে সীমিতসংখ্যক চিকিৎসক দিয়েই বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও ভর্তি রোগীদের চিকিৎসাসেবা সামলাতে হচ্ছে।
সংকট রয়েছে নার্সেরও। ২৫টি অনুমোদিত সিনিয়র স্টাফ নার্স পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৯ জন। ১৬টি পদই শূন্য। চিকিৎসক ও নার্সের এমন ঘাটতির মধ্যে হাসপাতালের দৈনন্দিন সেবা কতটা মানসম্মতভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
শুধু জনবল নয়, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় সেবার ঘাটতিও রয়েছে হাসপাতালে। এক্স-রে মেশিন থাকলেও নেই প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান। ফলে মেশিন থাকার পরও রোগীরা নিয়মিত এক্স-রে সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একইভাবে হাসপাতালে আলট্রাসনোগ্রাফি সেবা না থাকায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে পারছেন না উপকারভোগীরা। এতে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা অনেক রোগীকেই বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে আলট্রাসনোগ্রাফি করাতে হচ্ছে।
ফার্মাসিস্টের পদ শূন্য রয়েছে। ফলে ওষুধ ব্যবস্থাপনা ও রোগীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হচ্ছে। তবে ইসিজি সেবা চালু রয়েছে এবং ব্লাড ল্যাবরেটরিও কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
অন্যদিকে- দীর্ঘস্থায়ী সংকট প্রসূতি ও সিজারিয়ান সেবায়। সর্বশেষ অপারেশন হয়েছিল ২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। এরপর প্রায় নয় বছর ধরে আর কোনো সিজারিয়ান অপারেশন হয়নি। বর্তমানে হাসপাতালে গাইনি চিকিৎসক থাকলেও নেই অ্যানেসথেসিওলজিস্ট। দীর্ঘদিন সিজারিয়ান অপারেশন না হওয়ায় অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থেকে অপারেশনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
কোনো প্রসূতির সিজারিয়ান অপারেশনের প্রয়োজন হলে ছুটতে হয় আজমিরীগঞ্জের বাইরে। হাওরাঞ্চলের এই উপজেলার দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থায় জরুরি প্রসূতি রোগীকে দ্রুত অন্যত্র নেওয়া পরিবারের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে গুণতে হয় অতিরিক্ত অর্থ।
নবজাতক চিকিৎসাতেও রয়েছে ঘাটতি। শিশুদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই। জন্মের পর কোনো শিশুর বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ সীমিত। এতে নবজাতককে অন্যত্র নেওয়ার ঝুঁকি ও ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে।
নৈশ প্রহরীর পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ফলে রাতে হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে রয়েছে।
আজমিরীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এসব সংকট অবশ্য নতুন নয়। ২০২১ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চার বছর ধরে গাইনি চিকিৎসক না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছিল। ওই সময় চিকিৎসক-নার্স ও নৈশ প্রহরীর সংকটের কথাও তুলে ধরা হয়। বর্তমানে গাইনি চিকিৎসক থাকলেও সিজারিয়ান অপারেশন চালু হয়নি। অর্থাৎ একটি সংকটের পরিবর্তে নতুন করে সামনে এসেছে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট, অপারেশন যন্ত্রপাতি, নবজাতক চিকিৎসা, আলট্রাসনোগ্রাফি, ফার্মাসিস্ট ও অন্যান্য জনবল সংকট।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম দ্রুত চালু করার পাশাপাশি শূন্য পদে চিকিৎসক-নার্স ফার্মাসিস্ট, অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ও এক্স-রে টেকনিশিয়ান পদায়ন, আলট্রাসনোগ্রাফি সেবা চালু, নবজাতক চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া অপারেশন যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করে সিজারিয়ান সেবা চালু করা হোক। নিয়োগ,
এদিকে, হবিগঞ্জ-২ (আজমিরীগঞ্জ-বানিয়াচং) আসনের সংসদ সদস্য ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান জীবন ৫০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ডিও লেটার প্রেরণ করেছেন বলে জানা গেছে।
হাসপাতালের জনবল সংকট, অপারেশন রুমের নষ্ট হয়ে যাওয়া যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য সমস্যার বিষয়েও তিনি তথ্য নিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
আজমিরীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ ইকবাল হোসেন বলেন, "সংসদ সদস্য ৫০ শয্যার ভবন উদ্বোধন এবং হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের বিষয়ে তথ্য নিয়েছেন। হাসপাতালের জনবল সংকট, অপারেশন রুমের নষ্ট হয়ে যাওয়া যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সমস্যার বিষয়েও তিনি অবগত হয়েছেন। আমরাও যার যার অবস্থান থেকে এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।