
X
ছবি: প্রতিনিধি
দিনাজপুর সদর উপজেলার রাজবাটি এলাকায় অবস্থিত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আল-ফালাহ আম উন্নয়ন সংস্থার (আফাআউস) সাবেক প্রধান নির্বাহী মো. মমতাজুল ইসলামকে অপসারণের পরও স্বপদে ফিরে আসতে তদবির, চাপ প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মমতাজুল ইসলাম বলেছেন, প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে এবং তৎকালীন সরকারের রোষানলে পড়ে বিভিন্ন খাতে ব্যয় করতে গিয়ে আর্থিক ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব বলেও দাবি করেছেন তিনি।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৯ সালে স্থানীয় কয়েকজন উদ্যোক্তার উদ্যোগে সঞ্চয় কার্যক্রমের মাধ্যমে আফাআউসের যাত্রা শুরু হয়। মাত্র ১০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটির বর্তমানে বিনিয়োগ শতকোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ২০টি শাখা, ৩৪ হাজার ১৬ জন উপকারভোগী সদস্য, ২২ হাজার ৮৬৮ জন সরাসরি ঋণগ্রহীতা এবং ২২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। টিনশেড ভবন থেকে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে পাঁচতলা ভবনে উন্নীত হয়েছে, যার তৃতীয় তলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন মো. মমতাজুল ইসলাম। দীর্ঘ প্রায় তিন যুগের বেশি সময় দায়িত্ব পালনকালে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কার্যক্রমে তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে।
নিরীক্ষা শেষে গত ৮ এপ্রিল এমআরএর যুগ্ম পরিচালক লাকী পারভীনের স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে মমতাজুল ইসলামকে অপসারণের সিদ্ধান্ত জানানো হয় বলে প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে। ওই চিঠির পর আফাআউস কর্তৃপক্ষের ৪২তম জরুরি সভায় তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সময়ে এসএম মামুন উর রশিদকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে অপসারণের পরও মমতাজুল ইসলাম বিভিন্নভাবে পুনরায় দায়িত্বে ফিরতে তদবির করছেন বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, তিনি বিভিন্ন সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি, হুমকি এবং প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছেন।
এদিকে গত ১৬ জুলাই মমতাজুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানের প্যাড ব্যবহার করে মো. আব্দুল মান্নান সরকারকে সভাপতি এবং নিজেকে নির্বাহী সচিব করে একটি নতুন কমিটি গঠন করে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের বর্তমান কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই কমিটি বিধিসম্মত নয় এবং এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে গত ১৭ জুলাই ঢাকার মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় কৃষিবিদ গ্রুপ অডিটরিয়ামে আফাআউসের ৪৩তম বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রতিষ্ঠানের ১৯ জন বৈধ সদস্যের মধ্যে ১৪ জন উপস্থিত ছিলেন বলে জানানো হয়েছে। তাদের সর্বসম্মতিক্রমে মো. তমিজ উদ্দিনকে সভাপতি, অধ্যাপক আবু সালেহ মো. ইব্রাহিমকে সহ-সভাপতি, মোছাম্মৎ তাহেরা বেগমকে সেক্রেটারি এবং ডা. লুৎফর রহমান, মোহাম্মদ তাইবুর রহমান, মোছা. মেহেরুন্নেছা ও তৈমুল ইসলামকে নির্বাহী সদস্য করে সাত সদস্যের নতুন কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়।
এমআরএর নিরীক্ষা-সংক্রান্ত নথিতে সাবেক প্রধান নির্বাহীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগের কথা উল্লেখ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে পিকেএসএফের নির্দেশনা অনুযায়ী অবসরোত্তর কর্মকর্তাদের অব্যাহতি না দেওয়া, দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন না করা, বিভিন্ন শাখায় নগদ অর্থ দেখিয়ে নিজস্ব ব্যবসায় বিনিয়োগ, প্রতিষ্ঠানের অর্থ লিয়েন রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ, ইচ্ছেমতো জনবল নিয়োগ এবং অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিকে আফাআউসে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে বিভিন্ন শাখায় মোট ৪৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা নগদ দেখিয়ে নিজস্ব ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের অর্থ লিয়েন রেখে ব্যাংক থেকে ৯২ লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মমতাজুল ইসলাম দাবি করেছেন, বিষয়গুলো এমআরএর কাছে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ঋণ কার্যক্রম নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত শর্ত ভঙ্গ করে চলতি বছরের শুরুতে চিরিরবন্দর উপজেলার ৬৯ বছর বয়সী আনোয়ারা বেগমকে ১৫ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়। এছাড়া সদর উপজেলার নজরুল ইসলামকে ৩ লাখ টাকার পরিবর্তে ১০ লাখ টাকা, স্থাবর সম্পত্তি না থাকা সত্ত্বেও রওশন আরাকে ১০ লাখ টাকা এবং হনুফা আক্তারকে ১২ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
আফাআউসের বর্তমান সাধারণ পরিষদের সদস্য তৈমুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো নানা অনিয়ম করা হয়েছে। ২০১৭ সালে প্রাথমিক তদন্তে ১ কোটি ১৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকার গড়মিল পাওয়া যায়। তখন তিনি কয়েক দফায় কিছু টাকা জমা দেন। অবশিষ্ট প্রায় ৪২ লাখ টাকা একই বছরের ৩০ জুনের মধ্যে পরিশোধের কথা থাকলেও পরে তা খরচ হিসেবে দেখানো হয় এবং প্রতিষ্ঠানের কাছে ক্ষমা চেয়ে অঙ্গীকারনামা দেওয়া হয়। নিয়মনীতি না মেনে আত্মীয়স্বজনকে নিয়োগ দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় গত ২১ মে দিনাজপুর কোতোয়ালি থানায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও বর্তমান সভাপতি মো. তমিজ উদ্দিন বলেন, ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যেই আমরা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলাম। সম্মিলিতভাবে মমতাজুল ইসলামকে প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময়ে তিনি প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম করেছেন বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। এর ফলে দাতা সংস্থার তহবিল বন্ধ হয়ে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী এসএম মামুন উর রশিদ বলেন, ‘অপসারণের পরও তিনি বিভিন্ন সময় অফিসে আসছেন। শাখা ব্যবস্থাপকদের অর্থের জন্য চাপ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কয়েকদিন আগেও অফিসে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভ্রান্ত করার কারণে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সাবেক প্রধান নির্বাহী মো. মমতাজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে এবং তৎকালীন সরকারের রোষানলে পড়ে বিভিন্ন জায়গায় কিছু খরচ করতে হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান সভাপতি ও আরেকজন সদস্যের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে গৃহনির্মাণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এভাবে ফান্ডে ঘাটতি তৈরি হয়।
যেহেতু আমি প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ছিলাম, তাই বেশিরভাগ দায় আমার ওপরই এসেছে। এমআরএর কাছে বিষয়গুলো কিছুটা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আর্থিক বিষয়গুলো স্পর্শকাতর হওয়ায় এমআরএ আমাকে অপসারণ করেছে। তবে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনায় বসলে সমাধান করা সম্ভব।