
X
ছবি : প্রতিনিধি
একদিকে কোটি টাকা ব্যয়ে নদী খনন করে জলাবদ্ধতা নিরসন ও পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ, অন্যদিকে সেই নদীকেই প্রকাশ্যে বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত করা হচ্ছে। খুলনার ডুমুরিয়া সদরের প্রাণকেন্দ্রে সালতা নদী এখন পরিণত হয়েছে পচা-গলা আবর্জনা, পশুর নাড়িভুঁড়ি, মরা গরু-ছাগল, মাছ-মুরগির বর্জ্য ও প্লাস্টিকের স্তূপে। প্রশাসনের নাকের ডগায় বছরের পর বছর ধরে চলা এই পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ডুমুরিয়া ফুড অফিসের সামনে থানা সড়কের সেতুর ওপর থেকে রাতের আঁধারে নিয়মিতভাবে সালতা নদীতে ফেলা হচ্ছে বাজারের বিপুল পরিমাণ ময়লা-আবর্জনা। বর্জ্য ডাম্পিংয়ের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় নদীকেই ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ ডাম্পিং জোন হিসেবে। ফলে নদীর বুক ভরাট হয়ে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাড়ছে দূষণ ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের পর দিন নদীতে ফেলা বর্জ্যের স্তূপ থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। শত শত পথচারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে আসা মানুষকে নাক-মুখ চেপে চলাচল করতে হচ্ছে। সম্প্রতি নদীর পানি কালচে রং ধারণ করেছে। প্লাস্টিক, পলিথিন, পচা সবজি, মাছ ও মাংসের বর্জ্যে নদীর পরিবেশ ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় চা-দোকানি আব্দুর রহমান বলেন, “প্রতিদিন গভীর রাতে ভ্যানে করে বাজারের বর্জ্য এনে সেতুর ওপর থেকে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। একবার হাতেনাতে একজনকে ধরেছিলাম। সে আর ফেলবে না বলে চলে গেলেও পরে অন্যরা একই কাজ করছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা ইউনুচ আলী শেখের অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি বলেন, “নদীতে মরা গরু পর্যন্ত ফেলা হচ্ছে। কোনো কোনো দিন দুই-তিনটি মৃত গরুও পাওয়া যায়। গরুর নাড়িভুঁড়ি কুকুর টেনে আশপাশে ছড়িয়ে দেয়। দুর্গন্ধে এলাকায় থাকা দায় হয়ে গেছে।” তিনি আরও বলেন, “হাসপাতাল ও ক্লিনিকের রক্তমাখা বর্জ্য এবং একটি হাঁসের খামারের মৃত হাঁসও এখানে ফেলা হচ্ছে।”
এলাকাবাসীর দাবি, নদীতে বর্জ্য ফেলার কারণে শুধু পরিবেশ নয়, জনস্বাস্থ্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। দূষিত পানিতে মশা-মাছির উপদ্রব বেড়েছে। বর্ষা মৌসুমে এসব বর্জ্য পচে রোগজীবাণুর বিস্তার ঘটাচ্ছে।
ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গাজী হুমায়ুন কবির বুলু বলেন, “বহুবার বাজার কর্তৃপক্ষকে নদীতে বর্জ্য না ফেলতে বলা হয়েছে। কয়েক বছর আগে অস্থায়ী ডাস্টবিনও স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো কার্যকর হয়নি। রাতের অন্ধকারে এখনও নদীতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে।”
বাজার কমিটির সভাপতি মোল্যা মশিউর রহমান স্বীকার করেন, বাজারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বর্তমানে চরম সংকটে রয়েছে। তিনি বলেন, “উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান ও বাজার কমিটির নেতাদের নিয়ে বৈঠক করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট স্থান চূড়ান্ত করা হবে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা জায়গায় এবং নদীতে এভাবে বর্জ্য ফেলা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি। এতে বাতাসে ক্ষতিকর জীবাণু ছড়িয়ে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চর্মরোগ, বমিভাব, মাথাব্যথাসহ নানা সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।