
X
ছবি : প্রতিনিধি
পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের হোগলাবুনিয়া গ্রামে পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ও তার স্ত্রীকে মারধর, প্রাণনাশের হুমকি, পৈত্রিক সম্পত্তি জোরপূর্বক দখল এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হত্যা মামলায় আসামি করে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় উভয় পক্ষই ইন্দুরকানী থানায় পৃথক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে।
মঙ্গলবার ইন্দুরকানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহব্বত খান জিডি দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ভুক্তভোগী দম্পতি মো. শহিদুল ইসলাম ও মঞ্জু বেগমের দাবি, তারা ও তাদের ২০ জনেরও বেশি ওয়ারিশ পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত ১ একর ২১ শতাংশ জমির বৈধ মালিক। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জমিটি তাদের বাবা-চাচার নামে এসএ, আরএস ও বিএস রেকর্ডভুক্ত এবং সংশ্লিষ্ট দলিলপত্রও তাদের পরিবারের নামে রয়েছে। পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই তারা ওই সম্পত্তি ভোগদখলে ছিলেন।
অভিযোগকারী মঞ্জু বেগম বলেন, “৩০ জুলাই সকাল ৮টার দিকে প্রতিপক্ষের লোকজন আমাদের বাড়িতে এসে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। পরে আমাকে খাট থেকে টেনে ফেলে মারধর করে এবং দা দিয়ে জবাই করার হুমকি দেয়। আমার স্বামী প্রতিবন্ধী ও হৃদরোগে আক্রান্ত। তারা আমাদের ঘরের পেছনের অংশও ভাঙচুর করেছে।”
প্রতিবন্ধী শহিদুল ইসলাম হাওলাদার বলেন, “আমাকে ও আমার স্ত্রীকে মারধর করা হয়েছে। জমির সব বৈধ কাগজপত্র আমাদের কাছে রয়েছে।”
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য হাফিজুর রহমান অভিযোগ করেন, ২০১২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যুদ্ধাপরাধ মামলার রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী মোস্তফা হাওলাদার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমিটি দখল করেন এবং সেখানে থাকা গাছপালা বিক্রি করে দেন। তিনি দাবি করেন, তাদের পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় সে সময় থানায় অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি।
পরিবারটির দাবি, ২০১৩ সালে সন্ত্রাসী হামলায় আহত হয়ে মোস্তফা হাওলাদার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার পর জমির দখল বজায় রাখার উদ্দেশ্যে শহিদুল ইসলামের ছেলে সোলাইমান হাওলাদার ও তার ভাই আব্দুর রহিম হাওলাদারকে হত্যা মামলার আসামি করা হয়।
সোলাইমান হাওলাদার বলেন, “মোস্তফা হাওলাদার নিহত হওয়ার সময় আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আমাকে হত্যা মামলার আসামি করা হয়। দীর্ঘদিন কারাভোগের কারণে আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। একটি জমি বিরোধ আমাদের পুরো পরিবারকে নিঃস্ব করে দিয়েছে।”
থানায় দায়ের করা জিডি সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ জুলাই সকাল ৮টার দিকে বসতবাড়ির সামনে জমি নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে প্রতিপক্ষের লোকজন লাঠিসোঁটা, কিল-ঘুষি দিয়ে শহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রী মঞ্জু বেগমকে মারধর করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে তারা আহত হলে স্থানীয়রা উদ্ধার করে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। জিডিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, সরকার পরিবর্তনের পরও তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাছে পৈত্রিক সম্পত্তির দখল ফিরে পাওয়ার আবেদন করলেও কার্যকর কোনো প্রতিকার পাননি। তারা পৈত্রিক সম্পত্তির দখল পুনরুদ্ধার এবং হত্যা মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
তবে অভিযুক্ত আব্দুল কুদ্দুস হাওলাদার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তারা কোনো জমি দখল করেননি। তার দাবি, জমিটি তাদের পূর্বপুরুষের নামে সিএস রেকর্ডভুক্ত। পরবর্তী এসএ, আরএস ও বিএস রেকর্ডে ভুলবশত অন্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, তার ভাই মোস্তফা হাওলাদার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও তিনি নিজে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এছাড়া ৩০ জুলাই শহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর ওপর হামলার অভিযোগও তিনি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
এ বিষয়ে ইন্দুরকানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহব্বত খান বলেন, “দুপক্ষের দুটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলোর বেশির ভাগই দেওয়ানি প্রকৃতির, তবে কিছু বিষয় ফৌজদারি প্রকৃতির। আমরা ফৌজদারি বিষয়গুলো তদন্ত করছি। তদন্তে যার বিরুদ্ধে যতটুকু অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”