
X
শ্রীপুরে উদ্যোক্তার নতুন উদ্যোগ
কাঁঠালের মৌসুম এলেই গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা মেলে রসালো এ ফলের ব্যাপক সমারোহ। বিশেষ করে শ্রীপুরের উঁচু লাল মাটিতে উৎপাদিত কাঁঠাল স্বাদ ও ঘ্রাণের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। কিন্তু মৌসুমে উৎপাদন ও সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন দাম কমে যায়, অন্যদিকে সংরক্ষণের অভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাঁঠাল নষ্ট হয়ে যায়।
এই বাস্তবতায় কাঁঠালকে শুধু মৌসুমি ফল হিসেবে না দেখে প্রক্রিয়াজাত করে নতুন খাদ্যপণ্য তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন শ্রীপুর পৌরসভার বৈরাগীরচালা গ্রামের উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া। তাঁর উদ্যোগে কাঁঠালের রস ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে বিস্কুট। ইতোমধ্যে অনলাইন ক্রেতাদের মধ্যে এ পণ্যটি সাড়া ফেলেছে।
শ্রীপুরের মেহমান ফুড প্রতিষ্ঠানে তৈরি করা হচ্ছে কাঁঠালের এ বিস্কুট। উদ্যোক্তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাকা কাঁঠালের রসের সঙ্গে ঘি, বাটার, দুধ, ময়দাসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহার করা হয়। কৃত্রিম ফ্লেভার কিংবা ক্ষতিকর রাসায়নিক না মিশিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পণ্যটি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
কারখানার প্রধান কারিগর মানিক মিয়া জানান, বিস্কুট তৈরির শুরুতে পাকা কাঁঠালের কোষ ভালোভাবে ব্লেন্ড করা হয়। এরপর নির্ধারিত অনুপাতে ঘি, বাটার, দুধ, ময়দা ও অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হয় মণ্ড। পরে ডাইসের সাহায্যে নির্দিষ্ট আকৃতি দেওয়া হয় এবং ওভেনে বেক করা হয়। প্রস্তুত বিস্কুট প্যাকেটজাত করে বাজারে পাঠানো হচ্ছে।
বর্তমানে প্রতিটি বক্সে প্রায় ৮৫০ গ্রাম বিস্কুট দেওয়া হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। অনলাইনে অর্ডারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে যাচ্ছে শ্রীপুরের এই নতুন পণ্য।
কুরিয়ারকর্মী রাকিব জানান, গত দুই মাস ধরে নিয়মিত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাঁঠালের বিস্কুট পাঠানো হচ্ছে। অনেক ক্রেতা প্রথমবার পণ্য নেওয়ার পর পুনরায় অর্ডার করছেন। সময়ের সঙ্গে অর্ডারের পরিমাণও বাড়ছে বলে জানান তিনি।
উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ কেজি কাঁঠালের বিস্কুট বিক্রি হচ্ছে। বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর এই উদ্যোগের শুরু।
তিনি জানান, বিভিন্ন দেশে স্থানীয় ফল ও কৃষিপণ্য ব্যবহার করে নানা ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য তৈরি করতে দেখে তিনি আগ্রহী হন। বিশেষ করে চীনসহ কয়েকটি দেশে কাঁঠাল থেকে তৈরি বিভিন্ন খাদ্যপণ্য দেখে দেশে ফিরে এ বিষয়ে কাজ করার চিন্তা করেন। পরে নিজস্বভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে কাঁঠালের বিস্কুট তৈরির কাজ শুরু করেন।
আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া বলেন, “আমাদের দেশে অনেক কৃষিপণ্য প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হলেও সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে সেগুলোর বড় একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়। কাঁঠালের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা রয়েছে। তাই কাঁঠালকে দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য করার চিন্তা থেকেই বিস্কুট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন চলছে। ভবিষ্যতে কাঁঠালের ড্রাই কেক, চিপসসহ আরও কয়েক ধরনের পণ্য তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।”
স্থানীয় কাঁঠালচাষি নজরুল ইসলাম বলেন, মৌসুমে একসঙ্গে প্রচুর কাঁঠাল বাজারে ওঠায় অনেক সময় প্রত্যাশিত দাম পাওয়া যায় না। আবার বিক্রি করতে না পারলে ফল নষ্ট হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকদের কাছ থেকে বেশি পরিমাণ ফল কেনার সুযোগ তৈরি হবে। এতে উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য পাওয়ার পাশাপাশি কাঁঠালের অপচয়ও কমবে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীপুর উপজেলায় ৩ হাজার ৫০০ হেক্টরের বেশি জমিতে কাঁঠালের চাষ হয়। এখানকার মাটি ও পরিবেশ কাঁঠাল উৎপাদনের জন্য বেশ উপযোগী হওয়ায় এ অঞ্চলের কাঁঠালের আলাদা সুনাম রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, দেশে উৎপাদিত কাঁঠালের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিবছর নষ্ট হয়ে যায়। এ ক্ষতি কমাতে কাঁঠালকে বিভিন্ন মূল্যসংযোজিত খাদ্যপণ্যে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কাঁঠালের বীজ, কাঁচা ও পাকা অংশ ব্যবহার করে পাউডারসহ বিভিন্ন উপাদান তৈরি করা যায়। এসব উপাদান দিয়ে বিস্কুট, কেক, কুকিজ, ক্যান্ডিসহ নানা ধরনের খাদ্যপণ্য উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষিপণ্যের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি উদ্যোক্তা ও কৃষক উভয়েই লাভবান হতে পারেন। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান তৈরিরও সুযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রীপুরের এই উদ্যোগ শুধু একটি নতুন স্বাদের বিস্কুট তৈরির ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো ও স্থানীয় ফলকে শিল্পপণ্যে রূপ দেওয়ার সম্ভাবনা। এমন উদ্যোগ বাণিজ্যিকভাবে বিস্তৃত হলে মৌসুমনির্ভর কাঁঠালের বাজারকে সারা বছরের বাজারে পরিণত করা সম্ভব হতে পারে।
কৃষক, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁঠালকে কেন্দ্র করে প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলে একদিকে যেমন কৃষক তাঁদের উৎপাদিত ফলের ভালো দাম পাবেন, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষিপণ্য থেকেই তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান ও শিল্পের ক্ষেত্র। শ্রীপুরের কাঁঠাল তখন শুধু গাছেই নয়, বিস্কুটসহ নানা প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মধ্য দিয়েও পৌঁছে যেতে পারে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।