
X
রাজনৈতিক পালাবদলে বদলে গেল খোলস, কুড়িগ্রামে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাকে ঘিরে বিতর্ক
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরই কুড়িগ্রামে শুরু হয়েছে বহুরূপী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের খোলস বদলের প্রতিযোগিতা। ৫ আগস্টের পর রাতারাতি রাজনৈতিক খোলস পাল্টে বিএনপির খাতায় নাম লেখানো এবং সংগঠনের নাম ব্যবহার করে নানা অসামাজিক ও অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের এক সাবেক নেতার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে প্রকাশ, কুড়িগ্রাম জেলার ৪ নং ঘোগাদহ ইউনিয়নের শ্রী পূর্ণ চন্দ্র সরকার (জীবন) ২২ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা শাখা কর্তৃক অনুমোদিত ঘোগাদহ ইউনিয়ন কমিটির সহ-সভাপতি (ওয়ার্ড নং-০১) হিসেবে দায়িত্ব পান। তৎকালীন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ওমর ফারুক ও মো. ফিরোজ আহমেদ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এই কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন জেলা ও উপজেলার শীর্ষ আওয়ামী নেতাদের সাথে তার ঘনিষ্ঠ মেলামেশা ও দলীয় ব্যানার-ফেস্টুনে অংশ নেওয়ার একাধিক আলোকচিত্রও স্থানীয়দের হাতে রয়েছে। এ নিয়ে বর্তমানে ওই এলাকায় বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
তবে ক্ষমতার পালাবদলের পর তিনি কৌশলে খোলস পাল্টে ফেলেন। বর্তমানে তিনি "বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট" কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা শাখার আংশিক আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যার জেলা কার্যালয়: আদি কালী মন্দির, হরিকেশ, কুড়িগ্রাম। পূজা উদযাপন ফ্রন্টের পদবি ব্যবহার করার পাশাপাশি তিনি নিজেকে ঘোগাদহ ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দাবি করে বিএনপির রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন।
সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালামের জনসমাবেশ উপলক্ষে প্রকাশিত পোস্টারেও তাঁর ছবি ও যুবদলের পদবি শোভা পেতে দেখা গেছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র ও গোপন সূত্রে জানা গেছে, ঘোগাদহ ইউনিয়নের বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার হাত ধরেই মূলত পূর্ণ চন্দ্র সরকার (জীবন)-এর নাম বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট নেতার সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এই তথ্যের সরাসরি কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সরাসরি কোনো লিখিত প্রমাণ না মিললেও একজন স্বীকৃত ফ্যাসিস্ট ও সাবেক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকে যেভাবে প্রকাশ্য মিছিলে ও কমিটিতে জায়গা দেওয়া হয়েছে, তাতেই ওই স্থানীয় নেতার ভূমিকা ও সম্পর্কের বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
স্থানীয় সূত্র আরও জানায়, পূর্ণ চন্দ্র সরকার (জীবন) পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক পদ ভাঙিয়ে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রাপ্ত চাল এবং আর্থিক অনুদান জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে লুটপাট করেছেন। শুধু তা-ই নয়, ঘোগাদহ ইউনিয়নে অন্যান্য সংগঠনের অসাধু নেতাকর্মীদের সাথে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে তিনি নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছেন। গ্রামে কোনো ছোটখাটো বিবাদ বা আইনি জটিলতা তৈরি হলেই এই সিন্ডিকেট স্বঘোষিত "উকিল-ম্যাজিস্ট্রেট" সেজে সালিশের নামে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকাশ্যে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার দাবি করলেও রাতের আঁধারে বিগত দিনের পরাজিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের সাথে এখনও তাঁর নিয়মিত বসতি ও গোপন আড্ডা চলে। সেখানে চা-পান-সিগারেটের আসরের পাশাপাশি সুবিধাবাদী আওয়ামী কর্মীদের বিএনপিতে নাম ঢুকিয়ে দেওয়ার এবং মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পদ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসের অভিযোগ উঠেছে।
ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে একজন সাবেক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার এভাবে যুবদল ও পূজা উদযাপন ফ্রন্টের পদ ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, অনুদান আত্মসাৎ ও ‘পদ বাণিজ্যে’ লিপ্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ত্যাগী বিএনপি নেতা জানান, "বিগত ১৭ বছর যারা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, তারা আজ অবমূল্যায়িত। আর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক নেতারা রাতারাতি বিএনপিতে এসে পদ বিক্রির মতো অপকর্ম করছে। কার ছত্রছায়ায় এসব অনুপ্রবেশকারী দলে ঢুকে সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছে এবং দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে, তা অনতিবিলম্বে তদন্ত করা দরকার।
দলের ভাবমূর্তি রক্ষা ও সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই সুবিধাবাদী অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা ও ঘোগাদহ ইউনিয়নের স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আব্দুর রশিদ নয়ন বলেন, ঘোগাদহ ইউনিয়নের পূর্ণ চন্দ্র সরকার নামে আমাদের যুবদলের কোনো নেতাকর্মী বা দায়িত্বশীল পদে কেউ নেই। আমাদের সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে বা যুবদলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি কোনো অপকর্ম বা সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে, তবে বিষয়টির সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে, একজন সাবেক আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার পূজা উদযাপন ফ্রন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনে স্থান পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্ট, কুড়িগ্রাম জেলা শাখার আহ্বায়ক সুভাষ চন্দ্র সরকার।
তিনি জানান, পূর্ণ চন্দ্র সরকার ইতিপূর্বে বিএনপিতে একাধিক বড় পদে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে আমাকে বলেছিলেন। মূলত সেই মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই তাকে পদে নেওয়া হয়েছিল। তিনি যে বিগত দিনে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন সেটি গোপন করেছিলেন। ফ্যাসিবাদের দোসর বা স্বেচ্ছাসেবক লীগের পদে থাকা কোনো ব্যক্তির পূজা উদযাপন ফ্রন্টের মতো সংগঠনে স্থান পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তার এই জালিয়াতির বিষয়টি সামনে আসায় অনতিবিলম্বে তার বিরুদ্ধে জরুরি সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।