
X
সংগৃহীত ছবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষের কক্ষে এক শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগের দাবিতে কার্যালয় অবরুদ্ধ করেন শিক্ষার্থীরা। প্রাধ্যক্ষকে উদ্ধারে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে গেলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলায় হল সংসদের ভিপি আবু নাঈম ও জিএস ইমামুল হাসানসহ অন্তত ছয়জন আহত হন।
রবিবার (১৬ আগস্ট) দিবাগত রাত পৌনে ৩টার দিকে প্রাধ্যক্ষকে কার্যালয় থেকে বের করে নিতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে গেলে এ ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে হল সংসদের জিএস ইমামুল হাসানের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
তাৎক্ষণিকভাবে অন্য আহতদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরে আহতদের অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
জানা যায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং হল প্রাধ্যক্ষকে উদ্ধারে রাতে তার কার্যালয়ে উপস্থিত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আল মোজাদ্দেদী আলফেসানী, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম, ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. ইসরাফিল প্রাং এবং সহকারী প্রক্টররা। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা তাদেরও প্রাধ্যক্ষের কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখেন।
পরে দুই প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর সেখান থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের গেটে প্রক্টরের সঙ্গে হল সংসদের ভিপি আবু নাঈম, জিএস ইমামুল হাসানসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী অবস্থান করছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এর মধ্যেই হঠাৎ ছাত্রদলের একটি দল শিবিরবিরোধী স্লোগান দিতে দিতে মিছিল নিয়ে প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের দিকে আসে। মিছিলটি দেখে হল সংসদের ভিপি আবু নাঈম বলেন, ‘শহীদুল্লাহ হলের সন্ত্রাসীরা এখানে কী করছে?’ এরপরই ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ভিপি আবু নাঈমসহ সেখানে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ ওঠে। এতে ভিপি ও জিএসসহ অন্তত ছয়জন আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়ে হলের একটি পিলারের সঙ্গে ধাক্কা খান ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. ইসরাফিল প্রাং। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাকে সেখান থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেন। এ সময় হামলায় হল সংসদের জিএস ইমামুল হাসান রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে যান এবং ভিপি আবু নাঈমের পোশাক ছিঁড়ে যায়। পরবর্তীতে আহতদের উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হামলার পর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হল প্রাধ্যক্ষকে তার কার্যালয় থেকে বের করে নিয়ে যান। এরপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
এদিকে এসব ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম সোমবার সকালে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, নির্যাতক প্রভোস্টকে বাঁচাতে লাঠিয়াল বাহিনী হয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদলের হামলা।
ছাত্রকে প্রভোস্টকক্ষে আটকে নির্যাতনের প্রতিবাদে আন্দোলনরত এফএইচ হলের শিক্ষার্থী, হল সংসদ নেতৃবৃন্দ এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায্য আন্দোলনে সংহতি জানাতে আসা ডাকসু-হল সংসদ নেতৃবৃন্দের ওপর নির্লজ্জ হামলা চালিয়েছে ছাত্রদল।
তিনি লেখেন, শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত আন্দোলনো ভীত হয়ে নির্যাতক প্রভোস্ট ও প্রশাসন গভীর রাত পর্যন্ত তালবাহানা করে তারপর ছাত্রদলের বহিরাগত সন্ত্রাসীদের এনে এফএইচ হলে হামলা চালায়।
ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা দাবি করে তারা এফএইচ হল অফিসে অন্য হল থেকে আসা কাউকে থাকতে দেবেনা। অথচ তাদের হামলায় খোদ এফএইচ হলের ভিপি ও জিএস সহ শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আহত হয়েছেন। এই সন্ত্রাসী হামলার মধ্য দিয়ে ছাত্রদলের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নগ্ন চেহারাও প্রকাশ পেয়েছে।
তবে নির্যাতককে রক্ষার জন্য পুনরায় নির্যাতন চালানোর এই ঘটনার জবাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অবশ্যই দেবে।
তবে এসব ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর মো. ইসরাফিল রতনকে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেন নি।
এর আগে, হলের বিভিন্ন সংকট নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় রোবটিক্স অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহীম প্রভোস্টের বিরুদ্ধে মৌখিক ও শারীরিক হেনস্তার অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হলে তারা সন্ধ্যা থেকে প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে তার কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখেন।
তবে শিক্ষার্থীর নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হল প্রাধ্যক্ষ। তার দাবি, ওই শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে নানা মন্তব্য করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ওই শিক্ষার্থীকে অফিসে ডাকা হয়। ভুল স্বীকার করার পর তাকে নিজ মায়ের সঙ্গে কথা বলিয়ে এবং আপ্যায়ন শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, আন্দোলন চলাকালে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের ভিপি মো. আহসান হাবীব ইমরোজ অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন করলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সিসিটিভি ফুটেজ দেখানো কিংবা প্রভোস্টকে অপসারণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের বলেন, প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে তারা প্রভোস্টের কক্ষে অবস্থান করছেন। প্রভোস্ট নির্দোষ হলে সিসিটিভি ফুটেজ দেখাতে সমস্যা কোথায়—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।