
X
বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ
সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা দেশে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের ভিসা জটিলতা নিরসন, বাংলাদেশি কর্মীদের অভ্যন্তরীণভাবে মালিক পরিবর্তনের সুযোগ পুনর্বহাল এবং ছুটিতে দেশে এসে আটকে পড়া প্রবাসীদের দ্রুত আমিরাতে ফেরানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
এসব দাবি ও প্রস্তাবনা নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী এনআরবি সিআইপি ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা।
সোমবার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশ সিআইপি-বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা। সাক্ষাতে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের ভিসা জটিলতা দূরীকরণ, অভ্যন্তরীণভাবে মালিক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি এবং ছুটিতে দেশে এসে আটকে পড়া প্রবাসীদের পুনরায় আমিরাতে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়।
এসব বিষয় নিয়ে সোমবার বিকেলে রাজধানীর পল্টন টাওয়ারে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশে প্রবাসীদের সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর সঙ্গে বৈঠক করবেন বাংলাদেশ সিআইপি-বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা। বৈঠকে প্রবাসী ব্যবসায়ীদের সম্ভাব্য বিনিয়োগ, বিনিয়োগের পরিবেশ, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা এবং দ্রুত অনুমোদনের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা জানান, প্রস্তাবিত বিনিয়োগের প্রধান খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল ও এআইভিত্তিক ইসলামিক ব্যাংকিং, ড্রাই ফুড প্রসেসিং ও প্যাকেজিং, ই-রেন্টাল, সোলার প্যানেল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পর্যটন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা। ব্যবসায়ীদের মতে, সরকার বিনিয়োগের জন্য সহজ অনুমোদন, জমি বা লিজ সুবিধা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং ওয়ান-স্টপ সেবা নিশ্চিত করলে এই বিনিয়োগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
প্রবাসীরা জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশিরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের ভিসা জটিলতায় ভুগছেন। বিশেষ করে প্রায় ১২ বছর ধরে বাংলাদেশি কর্মীদের অভ্যন্তরীণভাবে মালিক পরিবর্তনের সুযোগ না থাকায় অনেক কর্মী কর্মসংস্থান ও জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। বাংলাদেশ ও আমিরাত সরকারের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে এই সুযোগ পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা বাতিলের কারণে হাজারও আমিরাত প্রবাসী দেশে আটকে পড়েছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। আটকে পড়া এসব প্রবাসীর অনেকেরই আমিরাতে চাকরি, ব্যবসা ও পরিবার রয়েছে। তাদের তালিকা তৈরি করে আমিরাত সরকারের সঙ্গে আলোচনা এবং পুনরায় আমিরাতে যাওয়ার সুযোগ তৈরিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়েছে।
প্রবাসীদের সেবা আরও কার্যকর করতে বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটে দক্ষ, অভিজ্ঞ, অরাজনৈতিক ও প্রবাসীবান্ধব কর্মকর্তা নিয়োগের দাবিও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার জরুরি হেল্পলাইন, ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ে প্রবাসী সহায়তা সেল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসীদের পক্ষ থেকে ভিসা জটিলতা নিরসন, বিদেশ যাওয়ার আগে ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ, সবার জন্য প্রবাসী কার্ড, স্থানীয় আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ, মৃত প্রবাসীর মরদেহ সরকারি খরচে দেশে আনা, জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা এবং রেমিট্যান্স প্রণোদনা বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া সাশ্রয়ী বিমান ভাড়া, প্রবাসীদের সম্পদ ও বিনিয়োগ সুরক্ষা, সহজ ঋণ, বীমা এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের সময় জরুরি সহায়তাসহ মোট ১৫ দফা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
১৫ দফা প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে-ভিসা জটিলতা নিরসন, ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ, সবার জন্য প্রবাসী কার্ড, স্থানীয় আইন বিষয়ে প্রশিক্ষণ, মৃত প্রবাসীর মরদেহ সরকারি খরচে দেশে আনা, জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা, রেমিট্যান্স প্রণোদনা বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী বিমান ভাড়া, প্রবাসীদের সম্পদ ও বিনিয়োগ সুরক্ষা, সহজ ঋণ, বীমা সুবিধা, মধ্যপ্রাচ্যে সংকটে জরুরি সহায়তা, ২৪ ঘণ্টার জরুরি হেল্পলাইন, ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থা এবং প্রবাসী সহায়তা সেল।
ব্যবসায়ী ও প্রবাসী প্রতিনিধিরা বলেন, “প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্সের উৎস নন; তারা বাংলাদেশের অর্থনীতির অংশীদার, বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগী।”
তাদের মতে, প্রস্তাবিত ১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রবাসীদের জন্য নিরাপদ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভিসা জটিলতা এবং দেশে আটকে পড়া প্রবাসীদের সমস্যা দ্রুত সমাধানে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা। প্রবাসীদের দাবি, সরকারের সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনা ও দ্রুত প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে যেমন প্রবাসীদের সংকট নিরসন সম্ভব, অন্যদিকে তাদের বিনিয়োগ দেশে এনে অর্থনীতি আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সিআইপি-বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক মোহাম্মদ রুবেল, সদস্য সচিব মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, সাংবাদিক কেরামত উল্লাহ বিপ্লব, সাংবাদিক শিবলী আল সাদিক, মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম সিআইপি, মোহাম্মদ মন্জুরুল হক সিআইপি, মোহাম্মদ শামসুজ্জামান সিআইপি, মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন সিআইপি, ব্যবসায়ী মাহামুদুল হাসান, মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম রাহী সিআইপি এবং ব্যবসায়ী এনামুল হক।
প্রবাসীদের মতে, সঠিক নীতি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নিশ্চিত করা গেলে প্রবাসীদের বিনিয়োগ যেমন দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে, তেমনি দীর্ঘদিনের ভিসা জটিলতা ও দেশে আটকে পড়া প্রবাসীদের সমস্যারও দ্রুত সমাধান সম্ভব।