
X
পরিকল্পনাবিদদের অভিযোগ, রাজধানীতে শিশু–কিশোরদের জন্য নতুন খেলার মাঠ কিংবা পার্ক তৈরির কোনো উদ্যোগ নেই। অথচ আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপে নগরীতে উন্মুক্ত জায়গা কমিয়ে ভবনের উচ্চতা বাড়ানোর পথে হাঁটছে সরকার। যার কারণে ঢাকা শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার জন্য যে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) তৈরি করা হয়েছিল, তা আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বুধবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) ভবনের কনফারেন্স হলরুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনাবিদরা এই অভিযোগ করেছেন। ‘ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধনের উদ্যোগ: বিআইপির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বিআইপি।
সংবাদ সম্মেলে লিখিত বক্তব্যে ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, এলাকাভিত্তিক জনঘনত্ব বিন্যাস, নগরজীবন রেখা, ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়ন, নাগরিক সুযোগ-সুবিধার মানদণ্ড প্রণয়ন, ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন ও উন্নয়ন স্বত্ব বিনিময়সহ বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে রাজধানীর সমস্যাগুলো কমিয়ে পরিকল্পিত শহর গড়ার লক্ষ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ২০২২ সালের ২৪ আগস্ট গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছিল।
ড্যাপ অনুমোদনের আগেও দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, বারবার পরিবর্তন আনা হয়। পরে রাজউকের এখতিয়ারভুক্ত এক হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য ঢাকা মহানগর এলাকায় ড্যাপের (২০১৬-২০৩৫) খসড়া ২০২০ সালে প্রকাশ করা হয়। এরপর খসড়ার ওপর সুপারিশ ও আপত্তি দাখিলের আহ্বান জানানো হয়। পরে তা বিবেচনা করে মহাপরিকল্পনাটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
ড্যাপের সাম্প্রতিক সংশোধনী প্রস্তাবনায় ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় এফএআর ২০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এফএআর হলো কোনো ভবনের মোট মেঝে এলাকা ও সেই জমির আকারের অনুপাত। যেমন, এফএআর ২.০ মানে ভবনের সব তলার মোট মেঝের এলাকা জমির আকারের দ্বিগুণ। উচ্চ এফএআর মানে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বেশি মানুষ বাস বা কাজ করতে পারবে। এতে ওই এলাকার ট্রাফিক ও অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির সহসভাপতি সৈয়দ শাহরিয়ার আমিন বলেন, আগামী ১০ বা ২০ বছর পর ঢাকায় কত মানুষ থাকবে, তা সরকারকে আগে ঠিক করতে হবে। এরপর নাগরিক সেবা নিশ্চিত করে ভবনের উচ্চতা বাড়িয়ে লোকসংখ্যা আরও বাড়ানো হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সৈয়দ শাহরিয়ার আমিন আরও বলেন, পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও পার্ক না থাকায় শিশু–কিশোরেরা বন্দী ঘরে মুঠোফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এতে তাদের মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্যের ঝুঁকিসহ নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সরকার এসব বিবেচনায় না নিয়ে শুধু ভবন কতটা উঁচু করার যায়, সেটা নিয়ে চিন্তা করছে।
সংবাদ সম্মেলনে ড্যাপ সংশোধনী বিষয়ে বিআইপি কয়েকটি প্রস্তাবও উপস্থাপন করে। এর মধ্যে রয়েছে—
# মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরু রাস্তার পাশে বহুতল ভবন নির্মাণ অনুমোদন বন্ধ করা।
# ছয়তলার ওপরে ভবনকে বহুতল ভবন হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় সংশোধন এনে অগ্নিনিরাপত্তামূলক প্রতিরোধক ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা।
# ব্যবসায়িক স্বার্থগোষ্ঠীর অনৈতিক চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার ত্রুটিপূর্ণ সংশোধন প্রক্রিয়া বন্ধ করা।
# বিভিন্ন সামাজিক, পরিবেশবাদী, পেশাজীবী ও নাগরিক সংগঠনের প্রস্তাবনা বিবেচনায় নিয়ে যেকোনো সংশোধন করা।
# কৃষিজমি, জলাভূমি ও বন্যা প্রবাহ এলাকায় বিদ্যমান সব ধরনের অবৈধ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বন্ধে রাজউক, মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করা এবং অবৈধ দখলদারদের আইনের আওতায় আনা।
# গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির মতো এলাকায় আবাসিক প্লটে উচ্চ এফএআর মান কমিয়ে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে আনা।
# আবাসিক এলাকার ভারসাম্য ও শৃঙ্খলা রক্ষায় ভবনের উচ্চতার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা এবং প্রস্তাবিত রাস্তায় এফএআর দেওয়ার মতো আত্মঘাতী চিন্তা থেকে সরে আসা।
#এলাকাভিত্তিক ভিন্নতা অনুযায়ী পৃথক জনঘনত্ব, এফএআর মান ও প্রতি পরিবারে জমির পরিমাণ নির্ধারণ করা।
প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়, এলাকাভিত্তিক এফএআর অতিক্রম করে প্লটভিত্তিক এফএআর বিবেচনায় নিয়ে ভবনের আকার, আয়তন ও উচ্চতার অনুমোদন দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিআইপির যুগ্ম সম্পাদক তামজিদুল ইসলাম, বোর্ড সদস্য আবু নাঈম সোহাগ ও ফাহিম আবেদিন।