ভুয়া বিনিয়োগ ও জুয়ার অ্যাপের খুদে বার্তায় সয়লাব মোবাইল অপারেটরদের নম্বর। একবার এই ফাঁদে পা দিলেই সর্বস্ব হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। গ্রাহকদের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক ও টেলিযোগাযোগ খাতের দুর্বল কাঠামোর ডিজিটালাইজেশন। এর সঙ্গে ব্যাংক ও মোবাইল অপারেটরদের অসহযোগিতা দিন দিন বাড়িয়ে তুলছে গ্রাহক ও আর্থিক খাতের নিরাপত্তা ঝুঁকি।
একটি ব্যাগে প্রায় ৬০ হাজার দেশীয় মোবাইল অপারেটরের সিমকার্ড—যার কোনোটি হতে পারে আপনার নামে বা আমার নামে নিবন্ধিত। এসব সিম ব্যবহার করেই পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন অনলাইন সাইট ও জুয়ার অ্যাপ। এই প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন মঞ্জুর হোসেন (ছদ্মনাম)।
অনলাইনে শেয়ারবাজারসংক্রান্ত কিছু পেজ অনুসরণ করার সূত্র ধরে মঞ্জুর হোসেনের কাছ থেকে দফায় দফায় প্রায় ১৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় প্রযুক্তি দুর্বৃত্তরা। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে স্টক এক্সচেঞ্জের মতো হুবহু অ্যাপ ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে ফাঁদ পাতা হয়। এতে বিপুল অঙ্কের অর্থের পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্যও বিদেশে পাচার হয়েছে।
প্রতারণার কৌশল হিসেবে মোবাইলে পাঠানো হয় লোভনীয় নোটিফিকেশন—‘আপনি ৫ লাখ টাকা জিতেছেন’, ‘১০ লাখ টাকা জিতেছেন’। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একবার এই টোপে সাড়া দিলেই নিশ্চিতভাবে সর্বস্ব হারাতে হয়।
সম্প্রতি এক ব্যবসায়ীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) কম্প্রোমাইজ হওয়ার পর তার মুঠোফোনে থাকা সব ধরনের ব্যবসায়িক ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ডাটাবেজ হ্যাক করে নেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযোগ, ব্যাংক ও মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর অসহযোগিতাই এসব আর্থিক ও তথ্য জালিয়াতিকে সহায়তা করছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, “এখন পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে কোনো সাইবার অপরাধ হলে অনেক প্রতিষ্ঠান পুলিশকে তথ্য দিতে চায় না। কাস্টমারের ডাটা প্রোটেকশনের অজুহাতে না বুঝেই অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের আড়াল করা হচ্ছে।”
এছাড়া প্রযুক্তিগত দুর্বলতার সুযোগে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘কল স্পুফিং’। এর মাধ্যমে যে কারো ফোন নম্বর ক্লোন করে নজরদারি চালানো বা জিম্মি করার ঘটনাও বাড়ছে। প্রযুক্তিবিদ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, দুর্বল কাঠামোর ডিজিটালাইজেশন আর্থিক খাতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
ডিএমপির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুণ অর রশীদ বলেন, “অনলাইনে যত প্রতারণা হচ্ছে, তার মূলেই রয়েছে এই সিমকার্ড। এটি কোনো ছোট ঘটনা নয়—এসবই রেজিস্টার্ড সিম।”
ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম বাড়ছে—এ কথা স্বীকার করে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়েই ডিজিটাল ব্যাংকিং, এমএফএস ও অপারেটরদের লাইসেন্স দেওয়া হয়। ফলে নিরাপত্তার দায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন,“গোয়েন্দা বাহিনীকে পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়ার বিষয়ে মোবাইল ব্যাংকিং ও অন্যান্য ব্যাংকগুলোকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে।”
তবে একই সঙ্গে গ্রাহকদেরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সন্দেহজনক লিংক, অ্যাপ কিংবা অপ্রত্যাশিত লাভের প্রলোভন এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।